অন্ধকার ও আলো সমান নয়

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অন্ধ ও চক্ষুষ্মান সমান নয়, না অন্ধকার ও আলো সমান পর্যায়ের, না শীতল ছায়া ও রোদের তাপ একই পর্যায়ের এবং না জীবিত ও মৃত সমান’ (সূরা ফাতির : ১৯-২২)।

এ আয়াতের উপমাগুলোতে মুমিন ও কাফেরের বর্তমান ও ভবিষ্যতের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। এদের এক ব্যক্তি প্রকৃত সত্য থেকে চোখ বন্ধ করে আছে। সে একবারও দেখছে না বিশ্ব জাহানের সমগ্র ব্যবস্থা এমনকি তার নিজের অস্তিত্ব কোন সত্যের প্রতি ইঙ্গিত করছে। অন্য দিকে, আর এক ব্যক্তির চোখ খোলা আছে। সে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে তার ভেতরের ও বাইরের প্রত্যেকটি জিনিস আল্লাহর একত্ব এবং তার সামনে মানুষের জবাবদিহির ওপর সাক্ষ্য দিচ্ছে। একদিকে এক ব্যক্তি জাহেলি কল্পনা ও ভাববাদ এবং ধারণা, আন্দাজ-অনুমানের অন্ধকারে হাতড়ে মরছে এবং নবীর জ্বালানো প্রদীপের কাছাকাছি ঘেষতেও রাজি নয়।

অন্য দিকে, অপর ব্যক্তির চোখ একদম খোলা। নবীর জ্বালানো আলোর সামনে আসতেই তার কাছে এ কথা একেবারেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, মুশরিক, কাফের ও নাস্তিক্যবাদীরা যেসব পথে চলছে সেগুলো ধ্বংসের দিকে চলে গেছে এবং সাফল্য ও মুক্তির পথ একমাত্র সেটিই যেটি আল্লাহ ও তার রাসূল দেখিয়েছেন। এখন দুনিয়ায় এদের দু’জনের নীতি এক হবে এবং একই সাথে পথ চলবে এটি কেমন করে সম্ভব। দু’জনের পরিণতি এক হবে, দু’জনই মরে খতম হয়ে যাবে, একজন কুপথগামিতার শাস্তি পাবে না এবং অন্যজন সৎপথে চলার জন্য কোনো পুরস্কার পাবে না, এটিই বা কেমন করে সম্ভব।

জুলুমাত তথা অন্ধকার ও নূর বা আলো কী করে সমান হতে পারে। জুলুমাত ও নূর শব্দদ্বয়ের মধ্যে নূর একবচন এবং জুলুমাত বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে আলোর পথ একটিই হয় আর জুলুমাত তথা অন্ধকারের পথ হয় অসংখ্য। যিনি আলোকিত পথে চলেন তিনি একটি সরল সোজা পথেই দেখতে পান এবং সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের পথে চলেন। তিনি যে পথের নির্দেশনা পেয়েছেন, যে পথে চলে তিনি সোজা মকসুদে মঞ্জিলে পৌঁছে যাবেন। পথটি সুস্পষ্ট ও আলোকিত হওয়ার দরুন তিনি অন্যপথে বা ভুল পথে চলার সম্ভাবনা নেই। কারণ আলোর পথটি সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট। পক্ষান্তরে অন্ধকারের পথ সুস্পষ্ট ও সুনির্ধারিত না হওয়ায় অন্ধকারে হাতড়িয়ে যেকোনো পথে চলতে পারে। এই চলার পথটি তার ইচ্ছামতো না-ও হতে পারে। চলতে চলতে সে যেকোনো গহ্বরে নিমজ্জিত হতে পারে। এ জন্য অন্ধকারের পথ হয় অসংখ্য ও অনির্ধারিত। আর এ জন্য জুলুমাত শব্দটিকে বহুবচনে ব্যবহার করা হয়েছে। নূর বা আলো হলো চক্ষুষ্মান, সে সুস্পষ্ট দেখতে পায়। পক্ষান্তরে অন্ধকার হলো অন্ধ বা আলোহীন। সুতরাং আলোর পথ অনুসারী সে চক্ষুষ্মান এবং অন্ধকারের পথ অনুসারী হলো চক্ষুহীন অন্ধ ব্যক্তির মতো।

শীতল ছায়া ও রোদের তাপ সমান নয়- এর মধ্যে এ পরিণতির দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, একজন আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় লাভকারী এবং অন্যজন জাহান্নামের উত্তাপে ঝলসানো ব্যক্তি। কোনো উদ্ভট চিন্তায় মাতোয়ারা ব্যক্তি ছাড়া কেউ বলবে না বা বিশ্বাস করবে না, এরা দু’জন একই পরিণাম ভোগ করবে। মুমিনকে জীবিতের সাথে এবং হঠকারী কাফেরদের মৃতদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ মুমিন হচ্ছে এমন ব্যক্তি যার মধ্যে অনুভূতি, উপলব্ধি, বিবেচনাবোধ, জ্ঞান, বুঝ ও চেতনা আছে এবং তার বিবেক তাকে ভালো ও মন্দের মধ্যকার পার্থক্য থেকে সবসময় সজাগ করছে। এর বিপরীত যে ব্যক্তি কুফরির অন্ধতায় পুরোপুরি ডুবে গেছে তার অবস্থা এমন অন্ধের চেয়েও খারাপ যে অন্ধকারে পথ হারিয়েছে। তার অবস্থা এখন এমন মৃতের মতো যার মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই।

‘(এ ব্যক্তির আচরণই সুন্দর না সেই ব্যক্তির আচরণ সুন্দর) যে অনুগত, রাতের বেলা দাঁড়ায় ও সিজদা করে আখিরাতকে ভয় করে এবং নিজের রবের রহমতের আশা করে? এদের জিজ্ঞেস করো যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি পরস্পর সমান হতে পারে? কেবল বিবেক-বুদ্ধির অধিকারীরাই উপদেশ গ্রহণ করে’ (সূরা জুুমার-৯)। এ আয়াতেও দুই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে তুলনা করা হচ্ছে। এ শ্রেণীর মানুষ দুঃসময় এলে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ে গায়রুল্লাহর বন্দেগি করে। আরেক শ্রেণীর আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁর দাসত্বকে তাদের স্থায়ী নীতি বানিয়ে নিয়েছে। রাতের অন্ধকারে তারা একনিষ্ঠ আল্লাহর ইবাদত করে।

প্রথম দলকে আল্লাহ জ্ঞানহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ক্ষেত্রে তারা বড় বড় গ্রন্থাগার চষে থাকলেও তারা মূর্খ। আর দ্বিতীয় দলের লোকদের জ্ঞানী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একেবারে নিরক্ষর হলেও কিছু আসে যায় না। কারণ প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে- সত্য সম্পর্কে জ্ঞান ও তদনুযায়ী কাজ। এর উপরেই মানুষের সাফল্য নির্ভরশীল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এই দুই শ্রেণীর মানুষ কী করে সমান হতে পারে। কী করে সম্ভব যে, তারা দুনিয়ায় মিলেমিশে একই নিয়ম-পন্থায় চলবে এবং আখিরাতে একই পরিণামের সম্মুখীন হবে।

মানুষ এ পৃথিবীতে জীবন, আয়ু, জ্ঞান-বুদ্ধি, শরীর, শক্তি, যোগ্যতা উপায়-উপকরণ ও সুযোগ-সুবিধা যত জিনিস লাভ করেছে তার সমষ্টি এমন একটি পুঁজি যা সে পার্থিব জীবনের কারবারে খাটায়। কেউ যদি পুঁজির সবটাই এ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কাটায় যে, কোনো ইলাহ নেই কিংবা অনেক ইলাহ আছে আর সে তাদের বান্দা। তাকে কারো কাছে হিসাব দিতে হবে না; কিংবা হিসাব-নিকাশের সময় অন্য কেউ এসে তাকে রক্ষা করবে, তাহলে তার অর্থ হচ্ছে- সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো এবং সব কিছু খুইয়ে দেউলিয়া হয়ে বসল। কোনো ব্যক্তির কারবারে খাটানো সব পুঁজি যদি নষ্ট হয়ে যায় এবং বাজারে তার পাওনাদারদের সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে, নিজের সব কিছু দিয়ে সে দায়মুক্ত হতে পারে না, তাহলে এরূপ অবস্থাকেই সাধারণভাবে দেউলিয়াত্ব বলে। দ্বিতীয় ক্ষতি হচ্ছে, এ ভ্রান্ত অনুমানের ভিত্তিতে সে যত কাজই করল সেসব কাজের ক্ষেত্রে সে নিজেকেসহ দুনিয়ার বহু মানুষ, ভবিষ্যৎ বংশধর ও আল্লাহর আরো বহু সৃষ্টির ওপর জীবনভর জুলুম করল। তাই তার বিরুদ্ধে অসংখ্য দাবি এলো। কিন্তু তার কাছে কিছুই নেই যে, সে এসব দাবি পূরণ করতে পারে। তা ছাড়া আরো একটি ক্ষতি হচ্ছে- সে নিজেই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হলো না; বরং নিজের সন্তান-সন্ততি, প্রিয়জন ও আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও স্বজাতিকেও তার ভ্রান্ত শিক্ষা-দীক্ষা এবং ভ্রান্ত দৃষ্টান্তে ক্ষতিগ্রস্ত করল। এ তিনটি ক্ষতির সমষ্টিকে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট ক্ষতি বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমরা তাঁর ছাড়া অন্য যাদের ইচ্ছা দাসত্ব করতে থাকো। বলো, প্রকৃত দেউলিয়া তারাই যারা কিয়ামতের দিন নিজেকে এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ভালো করে শুনে নাও, এটি হচ্ছে স্পষ্ট দেউলিয়াপনা’ (সূরা জুুমার-১৫) এরা হলো- প্রথম শ্রেণীর দলভুক্ত যারা অন্ধ, যারা অন্ধকারে নিমজ্জিত, যারা মৃত তারা জানে না। এদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন- ‘তাদেরকে মাথার ওপর থেকে এবং নিচে থেকে আগুনের স্তর আচ্ছাদিত করে রাখবে। এ পরিণাম সম্পর্কেই আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করেন, হে আমার বান্দারা, আমার গজব থেকে নিজেদের রক্ষা করো’ (সূরা জুমার-১৬)।

দ্বিতীয় দল যারা জানে, যারা চক্ষুষ্মান, যারা আলোকিত জীবনের অধিকারী, যারা জীবিত তারা জানে। তাদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘কিন্তু যেসব লোক তাগুতের দাসত্ব বর্জন করেছে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে তাদের জন্য সুসংবাদ। (হে নবী) আমার সেসব বান্দাকে সুসংবাদ দিয়ে দাও। যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে ও ভালো দিকটি অনুসরণ করে। এরাই সেসব মানুষ যাদের আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন এবং এরাই বুদ্ধিমান’ (সূরা জুমার : ১৭-১৮)। অর্থাৎ তারা যেকোনো কথা শুনলেই তা অনুসরণ করে না। তারা প্রত্যেকের কথা শুনে তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং যেটি ন্যায় ও সত্য তা গ্রহণ করে। কিংবা তারা কোনো কথা শুনে তার ভুল অর্থ করার চেষ্টা করে না; বরং তার ভালো অর্থ গ্রহণ করে।

(হে নবী!) ‘যে ব্যক্তিকে আজাব দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে তাকে কে রক্ষা করতে পারে? যে আগুনের মধ্যে পড়ে আছে তাকে কি তুমি রক্ষা করতে পারো? তবে যারা তাদের রবকে ভয় করে চলছে তাদের জন্য রয়েছে বহুতল সুউচ্চ বৃহৎ প্রাসাদ যার পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ কখনো তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না’ (সূরা জুমার : ১৯-২০)।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

  • জাফর আহমাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *