অবকাঠামোর চাপে ঢাকা ক্রমেই ডেবে যাচ্ছে কি

অনলাইন ডেস্ক: রাজধানী ঢাকায় গত দুই দশকে প্রচুর অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। নির্মাণ হয়েছে অনেক মেগাস্ট্রাকচার। চলমান ও পরিকল্পনাধীন রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি। অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণ ঘটা নগরীতে ভূমি ডেবে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করেছে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন বৃদ্ধি। আর এ প্রবণতা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি করছে ঢাকায় নির্মাণাধীন একের পর এক মেগাস্ট্রাকচার। একের পর এক অবকাঠামো চাপ বাড়াচ্ছে রাজধানীর ভূমির সহনশীলতায়। এতে রাজধানীর ভূমি ডেবে যাওয়ার প্রবণতাও এখন জোরালো হয়ে উঠেছে বলে নানা গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

স্বাধীনতার পর প্রথম এক দশক বেশ পরিকল্পিতভাবেই সম্প্রসারণ হয়েছিল ঢাকা। এ সম্প্রসারণ অপরিকল্পিত হয়ে ওঠার প্রবণতা তৈরি হয় আশির দশকে। এর পর থেকে এ পর্যন্ত গত কয়েক দশকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ও অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারণ হয়েছে ঢাকা। বর্তমানে রাজধানী হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে অপরিকল্পিত ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এ অপরিকল্পিত নগরায়ণই এখন ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার দুই সিটিতেই ভূমি ডেবে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূতাত্ত্বিক গঠনের দিক থেকে ঢাকা মধুপুর ট্র্যাকের অন্তর্ভুক্ত। আর এ এলাকার বেশির ভাগ মাটিই শক্ত। সে হিসেবে ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়ার প্রবণতা কম হওয়ার কথা। কিন্তু ঢাকার নগর সম্প্রসারণ খুব একটা স্বাভাবিকভাবে হয়নি। জলাভূমি, পুকুর, খাল, জলাশয় দখল করেও এখানে প্রচুর বহুতল ভবন গড়ে ওঠার নজির দেখা যায়। এ কারণে ঢাকার মিরপুর, উত্তরা ও ডেমরার মতো খাল-বিল ও নদ-নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় এখন ডেবে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে এখানে ভূগর্ভস্থ পানির মজুদ কমে আসছে। যে হারে মজুদ কমছে, সে হারে তা আবার পূরণ হচ্ছে না। এতে ভূমির স্তরও নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। সে হিসেবে গোটা ঢাকাই এখন ডেবে যাওয়ার বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।

ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়া নিয়ে টাইম সিরিজ গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের তিন শিক্ষক। ১৯৯৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনটি স্যাটেলাইট থেকে ইমেজ নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, রাজধানীতে ভূমি ডেবে যাওয়ার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এর মধ্যে মিরপুর ও উত্তরার ডেবে যাওয়ার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেশি। গত ২০ বছরে মিরপুর ১০ ইঞ্চি ও উত্তরা নয় ইঞ্চি ডেবে গিয়েছে। রমনা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা ডেবেছে প্রায় আট ইঞ্চি করে। একই পরিমাণ ডেবেছে লালবাগ ও ডেমরা অঞ্চল। এছাড়া গুলশান, তেজগাঁও, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর ডেবেছে সাত ইঞ্চি পরিমাণে।

এ বিষয়ে গবেষকদের একজন বণিক বার্তাকে বলেন, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে গবেষণায় পাওয়া ফলাফল কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। কিন্তু আমরা যেটা নিশ্চিত করে বলতে চাই, গত ২০ বছরে ঢাকার ভূমি অবনমন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণা ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকার ভূমি অবনমন সম্পর্কে একটি পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় ওয়াটার মডেলিংয়ের করা আরেকটি গবেষণায়। ২০০৫-০৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। গবেষক দলের এক সদস্য ড. সুজিত কুমার বালা। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, তখন আমাদের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, ঢাকার মাটি বেশ ভালোই শক্ত। ফলে ঢাকায় ভূমি ডেবে যাওয়ার ঝুঁকি তখনো আমরা পাইনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঢাকার নগরজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিপজ্জনকভাবে কমেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বেড়েছে ভারী অবকাঠামোর চাপ। ফলে এখন নতুন করে গবেষণা করে দেখতে হবে, ঝুঁকি কতটা বেড়েছে।

রাজধানীর ভূমির ওপর নতুন নতুন ভারী অবকাঠামো নির্মাণের চাপ বেড়েছে। এ চাপ এরই মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে নিচের দিকে ডাবতে থাকা নগরীকে ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা নগর গবেষকদের।

নগরীর চাপ বহনের সক্ষমতা যাচাই না করলে ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অবকাঠামোর চাপে ভারী হয়ে গিয়েছে ঢাকা। মেট্রোরেল, পাতাল রেল, বাণিজ্যিক ভবন ইত্যাদি নির্মাণ করা হচ্ছে, কিন্তু ভূমির সহনক্ষমতা নিয়ে গবেষণা না করলে ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে। অবকাঠামোর চাপে মেক্সিকো, ব্যাংককের মতো শহরে ভূমি ডেবে বিপর্যয় নেমে এসেছে। আমরাও সে ঝুঁকির দিকেই যাচ্ছি। আমাদের ঝুঁকির বড় কারণ হলো ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। ভূমির নিচের অংশের পানি যখনই কমে যায় তখন ওই অংশটুকু ফাঁকা হয়ে যায়। এর ওপর যদি অপরিকল্পিত ভারী অবকাঠামো নির্মাণ বাড়ে তাহলে সময়ের ব্যবধানে ভূমি অবনমন হতে বাধ্য। বিষয়টি নিয়ে এখনই সরকারকে সচেতন হতে হবে।

একই মত পোষণ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানও। তিনি বলেন, ঢাকার মাটি শক্ত হলেও সব এলাকার মাটি শক্ত নয়। বিশেষ করে ডেমরা, মিরপুর ও উত্তরার মাটি বেশ নরম। সেখানে ভারী অবকাঠামো নির্মাণের ফলে অবনমন বেশি হবে এটাই স্বাভাবিক। ক্যান্টনমেন্ট বা পুরান ঢাকার কথা যদি বলি এখানে অবনমনের হার কম হওয়ার কথা। হাজার বছর ধরে এখানে শক্ত মাটি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাজধানীতে যে হারে অবকাঠামো বাড়ছে এবং ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমতে দেখা যাচ্ছে তাতে এ নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে।

রাজধানীর সম্প্রসারিত এলাকাগুলো মূলত ছিল বিল ও নিচু ভূমি। সেগুলো ভরাট করেই আজকের নতুন ঢাকার সুরম্য অট্টালিকাগুলো নির্মাণ হচ্ছে। এসব এলাকার ভূমির সহনশীলতা ঢাকার অন্যান্য অংশের মতো নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকার মাটি বেশ শক্ত। বিশেষ করে লাল মাটি যেখানে আছে, ওইসব অঞ্চলে অবকাঠামোর চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বেশি। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে আমরা দেখছি, ওইসব এলাকায়ও ভূমি ডেবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এছাড়া নতুন ঢাকার যেসব অঞ্চলের নিচু ভূমি ভরাট করা হয়েছে, সেখানেও অবনমনের ঝুঁকি রয়েছে। এসব বিবেচনা করেই আমরা বলছি, অপরিকল্পিত অবকাঠামো ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

নিচু ভূমিতে অবনমনের হার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উল্লেখ করে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চের চেয়ারম্যান মো. এজাজ বলেন, উত্তরা, মিরপুর ও ডেমরার মতো এলাকাগুলোয় যে হারে অপরিকল্পিত অবকাঠামো বাড়ছে, প্রাকৃতিক কারণেই সেখানে একটা সময় ভূমি ডেবে যাবে। আর বাকি রইল পুরান ঢাকার কথা। আমরা বারবার বলছি, ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ বাড়াতে না পারলে মাটি যতই শক্ত হোক না কেন তা ডেবে যাবেই। ভূমি ডেবে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবকাঠামোর চাপের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানির পরিমাণ সম্পর্কিত। রাজধানীতে বিপুল পরিমাণ খাল-বিল দখল করে উন্নয়নের নামে ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমছে। সুতরাং ভূমি ডেবে যাওয়ার ঝুঁকি যে আমাদের বাড়ছেই, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা কম থাকায় এ নিয়ে খুব একটা ভাবছেন না সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাশেম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়ার ব্যাপারে বুয়েট ও ওয়াটার মডেলিং ২০০৫ সালে একটি গবেষণা করে বলেছে, এখানে ভূমি অবনমনের ঝুঁকি নেই। এরপর এ নিয়ে আর কোনো নির্ভরযোগ্য গবেষণা হয়নি। নগর নিয়ে পরিকল্পনায় নির্ভরযোগ্য গবেষণার বাইরে কিছু ভাবার সুযোগ আছে বলে মনে করি না।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকাকে বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে খালগুলো দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে উদ্ধারের ব্যবস্থা করেছি। ঢাকার ভূমি ডেবে যাওয়ার বিষয়টি তো গবেষণার বিষয়। তবে আমরা ঢাকাকে অপরিকল্পিত অবকাঠামোর শহর হিসেবে দেখতে চাই না। এ লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। ঢাকার সবুজ ভূমি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছি। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধির জন্যও আমাদের কাজ চলছে। আমরা ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়াচ্ছি। ঢাকার ডেবে যাওয়া রোধে মৌলিক কাজগুলোই আমরা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *