অর্থনীতিতে চাপ ঠেকানো কি সম্ভব?

অনলাইন ডেস্ক:রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দুয়েকটি বড় অর্থনীতির দেশ বাদ দেয়া হলে এর ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েছে অধিকাংশ দেশ। অর্থনৈতিক অঙ্গন ছেড়ে রাজনীতি ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ সৃষ্টি করছে এটি। এর ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি দক্ষিণ এশিয়া।
শ্রীলঙ্কায় এখন বড় আকারের রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে দেশটি। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অচলাবস্থার পথ ধরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। অস্থিরতা এখনো চলছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন তীব্র চাপের মুখে। অর্থনীতিতে সৃষ্ট এই চাপ ঠেকাতে নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই প্রচেষ্টায় সাফল্য কতটা আসতে পারে? এই প্রচেষ্টা কি কসমেটিক ধরনের হবে, নাকি সঙ্কটের মৌলিক বিষয়গুলো সংশোধনের উদ্যোগ রয়েছে এতে?

অর্থনীতিতে কী ঘটছে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির দৃশ্যমান পরিসংখ্যানের বড় অংশজুড়েই রয়েছে অগ্রগতির ধারাবাহিক প্রবণতা। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার বিবেচনা করা হলে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ধারাবাহিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। নমিন্যাল জিডিপি হিসাবে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম এবং আনুপাতিক ক্রয়ক্ষমতা বা পিপিপি হিসাবে ২৯তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দেশটি। বাজারভিত্তিক মিশ্র অর্থনীতির উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নেক্সট ইলেভেনের একটি উদীয়মান রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হয়। আইএমএফ-এর হিসাব অনুসারে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১,৯০৬ ডলার, যেটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাব অনুসারে ২০২১ সালে ২,৮২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে মোট জিডিপি ৩১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৮২ বিলিয়ন ডলার ।

তবে এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক সংশয় সৃষ্টি হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এই সংশয়ের মূল ক্ষেত্র হলো বৈদেশিক খাত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আকস্মিকভাবে বিশ্বব্যাপী জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। সে সাথে দু’বছরের করোনা সময়ের পর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসায় এক দিকে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে গেছে। অন্য দিকে করোনা সময়ে ডেফার্ড আমদানি এলসির পরিশোধের চাপ বেড়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৪৩ শতাংশের বেশি বেড়ে আমদানি ব্যয় ৬৬.৫ বিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে রফতানিতে ৩৩.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়ে আয় দাঁড়ায় ৪৩.৭ বিলিয়ন ডলারে। এই ৯ মাসে রেমিট্যান্স-সহ মাধ্যমিক আয় সোয়া ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৫.৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ফলে সর্বশেষ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪.০৭ বিলিয়ন ডলার। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার।
চলতি আয়ে এত বড় ঘাটতির কারণে সামগ্রিক লেনদেনেও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ছে। মে মাসের ২৫ দিনে রিজার্ভ কমেছে পৌনে দুই বিলিয়ন ডলার। এই অবনতির ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক খাতে বর্তমান যে সঙ্কট, তা সহজে মিটছে না। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যমূল্যও দ্রæত কমবে না। জাহাজভাড়াও এখনো অনেক বেশি। বাংলাদেশ এখনো অনেক ধরনের ভোগ্যপণ্যে আমদানিনির্ভর। প্রতি বছর শিল্প খাতের জন্য বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং পুঁজি যন্ত্রপাতি আনতে হয়। সবকিছুরই দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। আইএমএফ এর পূর্বাভাসে দেখা যায়, চলতি হিসাবের এই ঘাটতি ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাড়বে। আর চলতি সাল থেকে ক্রমেই এ কয়েক বছর অবস্থার অবনতি ঘটবে।

অ্যামচেমের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগে পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী, আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ফরেস্ট কুকসনের মতে, চলতি অর্থবছর ৯ মাসের ব্যয়ের ধারা অনুসারে বছর শেষে ৮৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বাংলাদেশকে আমদানি করতে হবে। আর এই অর্থবছর শেষে বাংলাদেশ ৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করতে পারবে। এর বাইরে ২০ বিলিয়ন ডলারের মতো রেমিট্যান্স আয় হতে পারে এই অর্থবছরে।

বাংলাদেশে এর আগে পুরো এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ আমদানি ব্যয় হয়েছিল ৬৫.৬ বিলিয়ন ডলার গত অর্থবছরেই; কিন্তু বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে আমদানি ব্যয় ৮৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হয় নতুন এলসির ধারা দেখে। নতুন এলসির হার আমদানি নিষ্পত্তির হারের চেয়ে বেশি। এই কারণেই পরের বছরগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

সঙ্কটের পেছনে মেগা প্রকল্প?
আমদানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা এবং করোনাÑ উত্তর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির স্বাভাবিক যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে তার বাইরে আরো দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এর একটি হলো বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প। এসব বড় প্রকল্প মোটা দাগে আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে কিছু প্রকল্প এমন রয়েছে, যা নেয়ার আগে অর্থনৈতিকভাবে তা লাভজনক হবে কি না তা যাচাই করা হয়নি সঠিকভাবে। আবার কিছু প্রকল্প রয়েছে যা যে ভিত্তিতে ‘প্রকল্প লাভজনক’ হবে বলে বিবেচনা করা হয় সেটি কয়েক দফা ব্যয় বাড়ানোর কারণে আর ঠিক থাকেনি। পদ্মা সেতু প্রত্যক্ষভাবে অর্থনৈতিক বিবেচনায় লাভজনক না হলেও এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাব বিবেচনায় এটি লাভজনক হবে বলে বিবেচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পটি জাতির মর্যাদা ও সংবেদনশীলতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু পদ্মা সেতুর ৫৭ ভাগ অর্থ ব্যয়ে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ আশুলিয়া-ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ নির্মাণাধীন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ খরচের তুলনায় এটিতে ২৮২ শতাংশ বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকাসাপেক্ষ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প নিয়ে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর, প্রফেসর মইনুল ইসলাম ও ড. দেবপ্রিয়সহ অনেক অর্থনীতিবিদ সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন তুলেছেন। বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রকল্প অর্ধেক খরচে প্রতিবেশী দেশে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সুন্দরবনের রামপালে থার্মাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে এর মধ্যে হাজার কোটি টাকা অপচয় করে বলা হচ্ছে, সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা যাবে না।

এভাবে হিসাব নিকাশ না করে প্রকল্প গ্রহণের ফলে বিদেশী ঋণ ও সুদ পরিশোধে আগামী তিন অর্থবছরে সরকারের ব্যয় বাড়বে ৬৫ শতাংশ। আগামী তিন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধেই সরকারকে ব্যয় করতে হবে ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বিদেশী ঋণের মূল পরিশোধ ব্যয় হবে ৭.১২ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হবে ২.৯৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়-এর প্রাক্কলন অনুসারে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ওঠা-নামা না থাকলেও প্রতি বছর এ খাতে ব্যয় বাড়বে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে ২.৪৪ বিলিয়ন ডলার। আর আগামী ২০২২-২০২৩ সালে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩-২০২৪ সালে ৩.২৮ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক দায় পরিশোধে মোট ব্যয় হবে ৪.০২ বিলিয়ন ডলার। নতুন করে দায় দেনা বাড়ানো না হলেও দায় পরিশোধে অঙ্ক বাড়তেই থাকবে। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ভারসাম্য, বাজেট ব্যয় এবং রিজার্ভের ওপর পড়বে।

অর্থপাচার
বাংলাদেশ থেকে ব্যাপক অর্থ পাচারের খবর বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে । অর্থনীতি সমিতির তথ্য অনুসারে, ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার বিলিয়ন ডলার ( আট লাখ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। সমিতির হিসাব অনুযায়ী, কালো অর্থনীতির আকার হলো ৮৮ লাখ কোটি টাকা। কুকসনের দেয়া তথ্য অনুসারে, হুন্ডি বাজার, ভুয়া এলসি, আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং এবং রফতানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে মূলধন পাচার হয়ে থাকে। ভুয়া বিদেশী কোম্পানি থেকে ভুয়া স্থানীয় কোম্পানি দ্বারা আমদানি করা হয়। ব্যাংক আমদানির জন্য অর্থ ঋণ দেয় যার বিপরীতে, পণ্য কোনো সময় আসে না। স্থানীয় ব্যাংকে বাধ্যতামূলকভাবে কুঋণ সৃষ্টি হয়। অর্থপাচারের আরেক ক্ষেত্র হলো, মূলধনী পণ্য আমদানির ওভার ইনভয়েসিং। মূলধনী পণ্যে কম আমদানি কর রয়েছে। ফলে ওভার ইনভয়েসিং করে এর মাধ্যমে অর্থ পাচার সহজ হয়। এ ছাড়া মূলধনী পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা খুব কঠিন হতে পারে, ফলে এর উচ্চ মূল্য কাস্টমসে সন্দেহ সৃষ্টি করে না। এ ছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতির কনটেইনারে ইট-বালু আসার পরও রাজনৈতিক চাপে তা নিয়ে কাস্টমসের উচ্চবাচ্য না করার ঘটনাও ঘটেছে।

রফতানি পণ্যের আন্ডার ইনভয়েসিং-এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক পোশাক কোম্পানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইইউতে কোম্পানি স্থাপন করে। প্রকৃত ক্রেতা প্রয়োজনীয় অর্ডারের জন্য সেই কোম্পানির সাথে চুক্তি করে। অর্ডারের জন্য সেই কোম্পানি বাংলাদেশি প্রস্তুতকারকের (সেই একই কোম্পানিরই মালিক) সাথে চুক্তি করে, কিন্তু কম দামে ।
এর বাইরে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ট্রাংকভর্তি অর্থ পাচারের কথাও মাঝে মধ্যে শোনা যায়।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশ্ব-অর্থনীতির বর্তমান সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে যদি আগামী দুই বছরে অর্থনীতি ৭.২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে চলতি বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার কমার পর পরবর্তী দুই বছরে রিজার্ভ কমবে মোট ২৫ বিলিয়ন ডলার হবে। এই পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করার জন্য কুকসন তিনটি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে, অর্থনীতির গতি কমানো; বিদেশী পুঁজির ব্যবহার বৃদ্ধি; এবং রফতানি বৃদ্ধি।

তিনি মনে করেন, কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে তা সবাইকে ‘বিরক্ত’ করা ছাড়া আর কিছু অর্জন করবে না। আগামী দুই-তিন বছরে অর্থনীতির মন্থরতায় কমবে আমদানি, কমবে মূলধন গঠন এবং দেশীয় উৎপাদন। এর একটি যুক্তিসঙ্গত লক্ষ্য হলো, এই সামঞ্জস্যের সময়কালে আরো ১২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কমবে।
২০২২ অর্থবছর থেকে ২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সময়কালে রিজার্ভ ৪৬.৬ বিলিয়নের প্রারম্ভিক স্তর থেকে ১৬.৩ বিলিয়ন ডলার কমবে। আর অর্থনীতি মাত্র ৪-৫% হারে বৃদ্ধি পাবে। তবে এই উত্তরণের পর রফতানি বাড়বে এবং প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

কুকসনের মতে, অর্থনীতির নীতি পুনর্গঠনের জন্য একটি সময়কাল প্রয়োজন হবে আসলে যার কোনো বিকল্প নেই। যদি এ সময়ে কেউ অর্থনীতিকে দ্রুত বর্ধনশীল রাখার চেষ্টা করে, তাহলে আমদানির প্রবাহ বাড়বে আর এটি মুদ্রার যথেষ্ট অবমূল্যায়ন ঘটাবে। অবমূল্যায়ন আমদানি হ্রাস করবে এবং তারপরে অবস্থান একই থাকবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা অর্থনীতিকে ধীর করে দেবে। এই বিবেচনায় অর্থনীতির যেখানে ধীরগতি অনিবার্য হতে চলেছে তাতে একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর এবং কম ব্যাঘাতমূলক হবে।

এ জন্য প্রথম ধাপ হলো সুদের হার বাড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে রফতানি শিল্প ব্যতীত ঋণের সীমা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। তবে দুই বছর শেষে সব সুদের হার নিয়ন্ত্রণ তুলে নিতে হবে। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হবে বিদেশী অর্থায়ন ব্যবহার বৃদ্ধি করা। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়া উচিত এমন প্রকল্পগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে, যা শুরু করার জন্য প্রস্তুত। এর মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও সফট প্রজেক্টের পরিবর্তে অবকাঠামো এবং দ্রæত রিটার্ন আসবে এমন প্রকল্পের ওপর জোর দেয়া উচিত।

রফতানি বৃদ্ধি উন্নয়ন নীতির একটি ক্ষেত্র। অনেক রফতানিকারক বিনিময় হারের পরিবর্তিত বাস্তবায়ন বুঝতে পারেনি এবং সুবিধার একটি অংশ রফতানিকারকের পরিবর্তে ব্যাংকগুলো দখল করেছে। এখানে একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারের নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং সবাই সিস্টেমটি বুঝতে না পারায় রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ডলার সঙ্কট ও বিনিময় হার নীতি
বাংলাদেশে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা খানিকটা অদ্ভুত। এটি প্রকৃতপক্ষে বাজার শক্তির কাছে সাড়া দেয় না; কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত স্তরে হার নির্ধারণের কোনো কারণ আছে বলে মনে করে না। জুলাই ২০১৯ এর শেষ থেকে আগস্ট ২০২১-এর শেষ পর্যন্ত সর্বাধিক এবং সর্বনিম্ন এর মধ্যে পার্থক্যের গড় ১%-এর কম ছিল। সত্যিকারের ভাসমান হারে কখনোই এ ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন একটি চিত্র উপস্থাপন করতে চায় যে, টাকার অবমূল্যায়ন হচ্ছে না। যখন বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের সবাই প্রকৃত পরিস্থিতি জানে তখন কেন তারা এটা করতে চায় কেউ ব্যাখ্যা করতে পারে না।
ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। চলতি হিসাবের ঘাটতির বড় বৃদ্ধি ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান তৈরি করেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডলারের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য করেছে।

২০২০/২১ সালে, মহামারী শুরু হওয়ার সময় বাংলাদেশে ১০ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। টাকার মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে তখন ডলার কিনতে হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। ২০২১-২২ সালে পরিস্থিতি বিপরীত হয় এবং ডলারের একটি বড় ঘাটতি দেখা দেয়। আমদানির ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে ব্যবধানটি খুব বড় ছিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, ফলে লেনদেনের বিনিময় হার (তিন দিন ফরোয়ার্ড রেট) ১০%-এর বেশি অবমূল্যায়ন হয়েছে।
গত এক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দু’টি পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি পরিচালনা করেছে : প্রথমত, বেশির ভাগ বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ফরওয়ার্ড মার্কেটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে; ফরোয়ার্ড মার্কেট সরবরাহ এবং চাহিদা অনুযায়ী সামঞ্জস্য করে। দ্বিতীয়ত, যখন ডলারের ঘাটতির কারণে বাজারের অবস্থা খুবই চাপে পড়ে তখন বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে দেয়।

৩১ মার্চ, ২০২২ পর্যন্ত গত নয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে কমপক্ষে তিন বিলিয়ন ডলার নেট রিলিজ করে এবং ফরওয়ার্ড এক্সচেঞ্জ রেট প্রায় ১০% অবমূল্যায়িত হয়েছে। অফিসিয়াল রেট কিছুটা অবমূল্যায়িত হয়েছে; কিন্তু সেই হারে অল্প লেনদেন হওয়ার কারণে এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বেশির ভাগ পর্যবেক্ষকই বুঝতে পারেননি যে, টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। এই অবমূল্যায়ন ইতোমধ্যে ঘটেছে।

আমদানি ও রফতানি বিল উভয়ই অফিসিয়াল স্পট হারের পরিবর্তে ফরওয়ার্ড হারে নিষ্পত্তি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক খুব ভালো করেই জানে, যে আপনার কাছে এমন দাম থাকতে পারে না, যা বাজার নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়। কেউ যদি সত্যিই এমন হার আরোপের চেষ্টা করে তাহলে বাজারে লভ্য ডলারের চেয়ে বেশি চাহিদা থাকলে একধরনের কালোবাজারি তৈরি হবে। সেটিই সম্প্রতি দেখা গেছে। বাংলাদেশে ব্যাংক বাফেডাকে নিয়ে ডলারের এক দর বেঁধে দিয়েছে। বাস্তবে সেটি কাজ করছে না। এখন বাজারে ডলারের ক্রেতা আছে; কিন্তু বিক্রেতা নেই। এই ধরনের অস্বাভাবিক ব্যবস্থা কাজ করবে বলে মনে হয় না।

ডলারের বিনিময় হারকে ঊর্ধ্বমুখী করতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুসারে প্রতি ডলারে টাকার প্রকৃত কার্যকর বিনিময় মূল্য হলো ১১৬ টাকার কাছাকাছি, যা আইএমএফের হিসাবে আরো অনেক বেশি। তবে এটি ঠিক যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিলে আমদানিনির্ভর সব পণ্যের দাম বাড়বে; মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফন হবে, যার একটি রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপে দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হয়।

সঙ্কট সমাধানে টোটকা!
সরকারের সামনে ডলারের বর্তমান সঙ্কট এমন একটি পরিস্থিতি হাজির করেছে, যাতে সমাধানের জন্য বিপরীতমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন অনুভ‚ত হচ্ছে। এক দিকে ডলারের রিজার্ভের ক্ষয় রোধের জন্য এর দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। অন্য দিকে টাকার মান অবনতি জীবনযাত্রায় অস্থির প্রভাব সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করছে। এক দিকে লেনদেনের ভারসাম্য ঠিক রাখতে বিদেশী অর্থের অন্তঃপ্রবাহের প্রয়োজন হচ্ছে। আবার বিদেশি বিনিয়োগ বর্ধিত হারে নেয়ার ফলে দায় পরিশোধে বোঝা বাড়ছে এবং প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন অনুভ‚ত হচ্ছে। এক দিকে সস্তা দামে তেল গম পেতে রাশিয়া এবং বড় বিনিয়োগ পেতে চীনের দিকে ছোটার জন্য প্রলুব্ধ হতে হচ্ছে, অন্য দিকে রফতানি ও রেমিট্যান্সের বাজার হারানোর মতো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা অবরোধের ভয় তাড়া করছে।
এ ধরনের এক পরিস্থিতি বাংলদেশের সামনে গত তিন দশকে আসেনি। এই অবস্থায় সুপরিণামদর্শিতার অভাব সব কিছুকে তছনছ করে দিতে পারে। এ সময় কয়েকটি পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, প্রক্রিয়াধীন মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনো বাস্তবায়ন পুরোদমে শুরু হয়নি সেগুলো স্থগিত রাখা, যেসব প্রকল্প শেষ পর্যায়ে রয়েছে সেগুলো দ্রæতগতিতে বাস্তবায়ন করা এবং এসব প্রকল্পের রিটার্ন নিশ্চিত করা, কম দামে রাশিয়ার তেল-গমের লোভ ত্যাগ করা এবং রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প রিভিউ করে এটিকে ছোট করে আনা, দ্বিতীয়ত, ডলার-টাকার বিনিময় মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে স্থির করা এবং তা যাতে সেঞ্চুরি অতিক্রম না করে সে দিকে লক্ষ রাখা। একদরে ডলার কেনাবেচার অবাস্তব নীতিতে নমনীয়তা নিয়ে আসা, এখানে সুনির্দিষ্ট দরের পরিবর্তে একটি ব্যাপ্তি ঠিক করে দেয়া। তৃতীয়ত, ডলারের বহিঃপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি সরবরাহকারী অংশীদারদের সাথে বিলম্বিত পরিশোধের একটি সমঝোতায় যাওয়ার চেষ্টা করা এবং সম্ভব হলে পরবর্তী তিন বছর যেসব মেগা প্রকল্পের দায় শোধের সূচি রয়েছে সেটি পুনর্নির্ধারণ করে পিছিয়ে দেয়া, যাতে রিজার্ভে চাপ কমে আসে। চতুর্থত, অর্থপাচার সব মাধ্যমে বন্ধের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়া এবং পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া, রিজার্ভের তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে এর বাইরে বিনিয়োগের ব্যাপারে সতর্ক নীতি গ্রহণ করা আর সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বড় ধরনের বিপর্যয়ের আগে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। হঠাৎ করে যেন নামী-বেনামী খেলাপি ঋণের কারণে অকার্যকর ঋণের অঙ্ক তিন গুণ হয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা কল্পনাতীত চাপে না পড়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *