আশুগঞ্জে র‌্যাবের অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে হাসান জাবেদ : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে তিন তারকা মানের হোটেল ও বারে দুই দফা অভিযান চালিয়েছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা। এ সময় বারে থাকা স্টাফ ও রেস্তোরায় খেতে আসা অতিথিদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তারা। দুই দফায় দুটি মামলায় গ্রেফতারকৃতদের দেখানো হয় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে। সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বারে অভিযান ও তাদের ওয়্যার হাউস থেকে বৈধ আমদানি করা মদকে অবৈধ বলে জব্দ করার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে আরজে টাওয়ার হোটেল ও রিসোর্ট এর পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন দাখিল করা হয়। পিটিশনের বিষয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি মামনুর রহমান ও খন্দকার দিলিরোজ্জামান এক মাসের রুল ইস্যু করেন। কেন এই অভিযান অবৈধ হবে না এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সচিব, পরিচালক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতর, আইজিপি, ডিজি র‌্যাব, এডিজি র‌্যাব, জেলা প্রশাসক ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কমান্ডিং অফিসার র‌্যাব ও ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পের কোম্পানী কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে এক মাসের মধ্যে রিটের জবাব দিতে বলা হয়। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে গেলেও রুলের জবাব দেয়নি কেউ।

আরজে টাওয়ারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, লাইসেন্সকৃত বারে অভিযান চালিয়ে বৈধ আমদানি করা মদকে অবৈধভাবে জব্দ করে হয়রানি করা হচ্ছে। বৈধ মাল ফেরতের জন্য আবেদন করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে র‌্যাবের দাবি তাদের অভিযান সঠিক।

আরজে টাওয়ার হোটেল ও রিসোর্ট সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন ২০১৮ এর ধারা ১০ ও ১৩ মোতাবেক ২০১৯ সালের ১৩ মার্চ আর জে টাওয়ার হোটেল ও রিসোর্ট এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নামে বার লাইসেন্স (১/২০১৮-১৯) অনুমোদন করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কার্যালয়। এরপর ২০২০ থেকে আশুগঞ্জ গোলচত্তর এলাকায় অবস্থিত আর জে টারওয়ার হোটেল এন্ড রিসোর্ট এর নিচ তলায় বারের কার্যক্রম শুরু করেন তারা। লাইসেন্সে তিন হাজার লিটার মদ ও মদ জাতীয় পানিয় মজুদদের অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়াও ২০১৯ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে আমদানি করা ১৮ টি ব্যান্ডের বিদেশি মদ ও মদ জাতীয় পানিয় কেনার অনুমোদন পায় আর জে টাওয়ার হোটেল ও রিসোর্ট। কিন্ত কিছুদিন যেতে না যেতেই দুই দফা অভিযান চালায় কিশোরগঞ্জের ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা। এ সময় বারের স্টাফ, পারমিট হোল্ডার ও রেস্তোরায় খেতে আসা অতিথিদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তারা। দুই দফায় দুটি মামলায় গ্রেফতারকৃত সকলকেই দেখানো হয় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে। ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে চালানো প্রথম অভিযানে ৭৬ বোতল বিদেশি হুইস্কি, ৭২ বোতল বিদেশি ভডকা, ১৩১ ক্যান বিয়ার এবং এক লাখ ৬৮ হাজার টাকা জব্দ করে। এ সময় আরজে টারওয়ারের স্টাফ ফেরদৌস চৌধুরী, আলাউদ্দিন, আকমল হোসেন, মনিরুজ্জামান, আশিক, রুবেল, মুন্না, তাজুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ হায়দার, মো. জাকির হোসেন, শাহিনুর, মোহাম্মদ শাহজালালসহ ২২ জনকে গ্রেফতার দেখায় র‌্যাব। এবং প্রত্যেককেই মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে এজাহারে উল্লেখ করে আশুগঞ্জ থানায় নিয়মিত মামলা করেন র‌্যাব।

এরপর ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবার আবারও কিশোরগঞ্জের ভৈরব র‌্যাব ক্যাম্পের সদস্যরা অভিযান চালায় আরজে টাওয়ারের বারে। প্রায় ২৭ ঘন্টাব্যাপী অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের অনুমোদিত ওয়্যারহাউস থেকে বিদেশি ১২০ বোতল হুইস্কি, ৭৪৯ বোতল ভটকা ও ৩ হাজার ৯৮০ বোতল বিয়ার জব্দ করা হয়। এই ঘটনায় শুক্রবার ১৫ অক্টোবর রাতে আশুগঞ্জ থানায় ৩৯ জনকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করে নিয়মিত মামলা দায়ের করেছে র‍্যাব। এই অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের ২৯ নভেম্বর উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। আরেজে টাওয়ারের বারে চালানো দুটি অভিযানের সময় জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের কোন কর্মকর্তা কিংবা জেলা প্রশাসনের কোন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট র‌্যাবের সাথে ছিল না। তবে পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের জেলা শাখার একজনকে ডেকে নিয়ে আসেন র‌্যাব সদস্যরা। তবে জব্দ তালিকায় কারও কোন স্বাক্ষর নাই। অভিযান কেন অবৈধ হবে না জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে গেলেও রুলের জবাব দেয়নি কেউ। এদিকে ১৪ অক্টোবর আরজে টাওয়ার বার এর ওয়্যারহাউস থেকে জব্দ করা বিদেশি ১২০ বোতল হুইস্কি, ৭৪৯ বোতল ভটকা ও ৩ হাজার ৯৮০ বোতল বিয়ার ফেরত চেয়ে নিম্ম আদালতে আবেদন করেছে আরজে টাওয়ারের পক্ষ থেকে।

আরজে টাওয়ার হোটেল ও রিসোর্টের পরিচালক সরওয়ার শফিক বলেন, দুটি ঘটনাতেই র‌্যাবের অভিযানের সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের কর্মকর্তা কিংবা জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট র‌্যাবের সাথে ছিল না। যদিও পরবর্তিতে র‌্যাব সদস্যরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরেরএকজন পরিদর্শককে ডেকে নিয়ে আসেন। কিন্তু জব্দ তালিকা করার সময় তাকে রাখা হয়নি। পাশাপাশি জব্দ তালিকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের কারও স্বাক্ষর নাই। সরকার অনুমোদিত বারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদফতরের কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া অভিযান চালানো যায়না। তবুও র‌্যাবের সদস্যরা বার বার অভিযান চালাচ্ছে। এবং কারও কোন কথা ও কাগজপত্র না দেখেই তারা তাদের মত করে ওয়ারহাউস থেকে বৈধ মদ ও মদ জাতীয় পানীয় জব্দ করে হয়রানি করছে। এসব বিষয়ে আমরা হাইকোর্টে আপিল করেছি। কেন বৈধ বারে বার বার হয়রানি করা হচ্ছে। তাছাড়া আরজে টাওয়ার হোটেল ও রিসোর্ট বারের পাশাপাশি একটি রেস্তোরাও রয়েছে। এখানে অনেকেই আসেন খাবার খাওয়ার জন্য। র‌্যাব সদস্যরা তাদেরও ধরে নিয়ে মাদক ব্যবসায়ী বানিয়ে দিয়েছেন। বার থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া কাউকেই ডোপ টেস্ট করা হয়নি। বিষয়টি খুবই দু:খজনক। তাছাড়া জব্দ হওয়া আমাদের বৈধ মদ ফেরত পাওয়ার জন্য আমরা আদালতে আবেদন করেছি।

র‌্যাব ১৪ সিপিসি ৩ ভৈরব ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার রফিউদ্দিন মোহাম্মদ যোবায়ের বলেন, আরজে টাওয়ার থেকে আমরা কোন বৈধ মদ কিংবা মদ জাতীয় পানিয় জব্দ করিনি। কোন বৈধ মাল যখন অবৈধ ব্যক্তির কাছে পাওয়া যায় তখন সেই মাল অবৈধ হয়ে যায়। মদ বৈধ হয় পারমিট হোল্ডারদের জন্য। তাহলে বারের ভিতরে পারমিট ছাড়া ব্যক্তিদের কাছে কেন মদ বিক্রি করল। আমরা আমাদের দিক থেকে ঠিক থেকেই অভিযান পরিচালনা করেছি। কেউ সংক্ষুব্ধ হলে উচ্চ আদালতে যেতে পারেন।

এসব বিষয়ে রিটকারির আইনজীবি মাজেদুল হাসান মাজেদ বলেন, আরজে টাওয়ার হোটেল ও রিসোর্ট এর রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আরজে টাওয়ারের বারের অভিযান কেন অবৈধ হবে না জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল দিয়েছেন। এরমধ্যে যদি কেউ জবাব না দেন তাহলে শুনানি করা হবে। এরপর আদালত যে নির্দেশনা দিবেন সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *