চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সত্ত্বে আমেরিকা

অনলাইন ডেস্ক:   সেটা ছিল আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে আমাদের ভাষায় আমেরিকান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নেড প্রাইসের এক রেগুলার রুটিন প্রেস ব্রিফিং। কিন্তু ব্যাপারটা আর রুটিন থাকেনি। মনে হয়েছে তা ‘বিশেষ’ হয়ে গেছে। প্রাইস অন্য এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলে বসেন, পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনারÑ ‘পাকিস্তান ইজ এ স্ট্রাটেজিক পার্টনার অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’।

পাকিস্তান অবশ্যই স্ট্রাটেজিক পার্টনার কিন্তু একালে কোনো কারণে সে কথা উঠে গেলেও সাথে বলে দেয়া হয় ওটাÑ পাস্ট টেনসÑ যেন বলা মানে এককালে ছিল। মানে চলতি একুশ শতকের শুরুতে আমেরিকার আফগানিস্তান দখল শুরু থেকে তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে সেই থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ‘স্ট্রাটেজিক পার্টনার’ করে রেখেছিল, সেটি জোর জবরদস্তি করে হলেও

তবে সেটি টিকে ছিল এবং অত্যন্ত সরবভাবে অন্তত ওবামা আমল মানে, ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত যা এরপর থেকে ট্রাম্পের আমলে এসে অনুচ্চারিত হতে হতে ‘নাই’ হয়ে যায়। আর ট্রাম্পের আমলের আমেরিকার ব্যবহারিক আচরণ ও তৎপরতা দেখেই সবাই বুঝে গিয়েছিল ‘দিন বদলে গেছে’। কারণ আমেরিকা তখন আফগানিস্তানে যুদ্ধের খরচ বইবার মুরোদহীন হতে হতে ভারে কাত হওয়া শুরু করেছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার আমেরিকার ব্যয় হাসিঠাট্টার ইস্যু নয় নিশ্চয়। আমেরিকার এই আচরণ যে ‘আফগানিস্তান ফেলে পালাতে পারলে বাঁচে’, এমন জায়গায় পৌঁছেছে তা তখন সবাই বুঝেছিল। ফলে ‘পাকিস্তান আর আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার’ তখনো কি না, সেটি অনুচ্চারিত থাকাকেই সবার কাছে স্বাভাবিক ঠেকেছিল বা সয়ে গেছিল।

কিন্তু এখন মানে, প্রায় পাঁচ বছর পরে আবার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র যিনি সাধারণত তার বিভাগের স্থায়ী কিছু অবস্থান-সিদ্ধান্তগুলোর উপরে দাঁড়িয়ে প্রেসের সাথে কথা বলেন, তিনি যখন আবার সে কথা ফিরে উচ্চারণ করে বলেনÑ ‘পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার’, তখন তা একটি নড়েচড়ে বসে নজর করার মতো ঘটনা তো বটেই। শুধু তা-ই নয়, মানে এটি বিচ্ছিন্ন একটি বাক্য নয়। কারণ শুধু ওই বাক্যটাই নয়। এর পরে তিনি ওই বাক্যকে ফিরে আরো শক্তপোক্ত করতে আরো কয়েকটি বাক্যও যোগ করেন।

ঘটনার শুরু যদিও ইন্ডিয়া থেকে
ঘটনার শুরু ইন্ডিয়া থেকে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দায়ী করে বলেছিলেন, ‘তার ভুল ও অবিবেচক ক‚টনীতির কারণে, চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক আগের চেয়ে এত বেশি ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে গেছে।’ এ দিকে ভারতে আগামী ১০ ফেব্রæয়ারি থেকে উত্তরপ্রদেশসহ পাঁচ রাজ্যে প্রাদেশিক বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে পাঁচ-পর্বে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে চলবে, পরে মাস শেষে একসাথে ফল প্রকাশ করা হবে। এই নির্বাচন ভারতের রাজনীতি এলোমেলো করে দেয়ার মতো এক মুখ্য ঘটনাও হয়ে যেতে পারে। কারণ বিজেপি নিজেই প্রকাশ্যে নিজের মনের কথা বলেছে যে, এবারের উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে যদি বিজেপি হেরে যায় সেটি ২০২৪ সালের মোদির নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা ও প্রভাব ফেলবে; সে নির্বাচনে জেতা কঠিন হয়ে যাবে।

তবু এখনো এটি ভারতের জন্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিতে তা এখনো এক স্থানীয় ঘটনাই। বিরোধী রাহুল গান্ধী মোদি ও বিজেপিকে ঘায়েল করতে এমন মন্তব্য করেছেনÑ যেমনটি ইলেকশনে এমন কিছু কাদা ছোড়াছুড়ি হয়েই থাকে। কিন্তু মোদির পক্ষের লোক সেই ইস্যুটাকে আমেরিকান প্রেস ব্রিফিংয়ে তুলে সেখান থেকে জবাব এনে রাহুলের ওপর আপার-হ্যান্ড নিতে চেয়েছিলেন সম্ভবত; আর তা থেকেই…।

আমেরিকান মুখপাত্র নেড প্রাইস ব্যাপারটাকে ভারতের এক স্থানীয় ঘটনাই করে রেখে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতেন। কিছুটা করেও ছিলেন। তিনি বলেছিলেন তিনি চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ককে তাদের ওপরই ছেড়ে দিয়ে রাখতে চান, এতে ঢুকতে চান না। তবে তিনি জানিয়ে দেন যে, রাহুলের বক্তব্যকে অনুমোদন দিয়ে তিনি এর পক্ষেও দাঁড়াচ্ছেন না।

কিন্তু তা থেকেই আরো উসকানিমূলক প্রশ্ন করার সুযোগ করে নেন প্রশ্নকর্তা; যেটাকে অনেকে ‘অ্যারেঞ্জড’ মানে আগে থেকে আগাম আঁতাত বোঝাবুঝিতে থাকা উভয়ের এক সওয়াল-জবাব পরিস্থিতি তৈরি করে কথাবলা অনেকে মনে করতে পারেন। এটি খুব কমন যদিও খুব সীমিতভাবে এমনটি অনেক সময় হয়েই থাকে। তবে এটি সাংবাদিকের ‘তেলের ভাণ্ড’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন (নাকি তোয়াজ) করতে বসার মতো নয় অবশ্যই। তেমন মনে করা মারাত্মক ভুল হবে।

যা হোক সে প্রশ্নটা ছিল, পাকিস্তানের এমন দূরে চলে যাওয়া বা চীন-ঘনিষ্ঠ হয়ে যাওয়া কীÑ আমেরিকার তাদেরকে (বিশেষত পাকিস্তানকে) পরিত্যাগ করে ফেলে পালানোর জন্য ঘটছে কি নাÑ এ প্রশ্ন তুলে বসেন।

আর এমন প্রশ্নের জবাব দেয়ার সুযোগ নিয়ে এবার যেন নেড প্রাইস তার নয়া বিস্তারিত মেসেজ হাজির করার সুযোগ নিলেন। আর তাতে তিনি মূলত আরো দু’টি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।

এক. প্রাইস বলছেন, আমরা অনেক দিন থেকেই বলছি, ‘যেকোনো একটি দেশের জন্য তারা আমেরিকা না হলে চীনকে বেছে নিতে হবে, ব্যাপারটি একেবারেই এমন প্রয়োজনীয় নয়।’ তবে এর পরই প্রাইস চীনের চেয়ে আমেরিকা কেন অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ভালো এবং তাদের অনেক বাড়তি সুবিধা ও সে দেশকে মুক্ত থাকতে দেয় এসব দিক নিয়ে নিজের কিছু বিজ্ঞাপনও প্রচার করে নেন।
দুই. এরপর প্রাইসের সেই উক্তি যে ‘পাকিস্তান আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার।’ আর এ কথা বলার পরে আরো দুই বাক্য হলোÑ ইসলামাবাদের সাথে আমাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পর্ক আছে। আর আমরা এই সম্পর্ককে বিভিন্ন পরিসরে খুবই মূল্য দিয়ে থাকি।’ অর্থাৎ তিনি যেন বলতে চাইছেন আমরা যেন এগুলোকে কথার কথা হিসেবে না, সিরিয়াস কথা বলে দেখি।

নেড প্রাইস কেন এখন এ কথাগুলো বলছেন
এখানে একটা ব্যাকগ্রাউন্ড বা যে পটভ‚মিতে এ কথাগুলো উঠেছে তা পাঠককে মনে করিয়ে দেই। সেই পটভ‚মিটা হলো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এখন চার দিনের (৩-৬ ফেব্রæয়ারি) চীন সফরে আছেন। এই মুখ্য কারণ চীনে আয়োজিত এবারের অলিম্পিক, এই গ্লোবাল স্পোর্টসে অন্যান্য সরকারপ্রধানের সাথে ইমরান খানের যোগ দিতে চীন সফর। আবার বিশেষত এ অলিম্পিককে বাইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কটের ডাক দিয়েছেন। আর কারণ দেখিয়েছেন সেই পুরনো উইঘুর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তিনিও জানেন যে, এমন বারবার একই কারণ দেখানোটা মানুষ ভালো মনে করছে না আর তিনি নিজেও এতে সিরিয়াস নন ও মন শক্ত না করে অস্পষ্টভাবে উইঘুরের কথা তুলছেন। এমন মনে হতে পারে যার কারণ হলো, উইঘুর সশস্ত্র গ্রæপ এখন আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধবাদী আইএসের সাথে মিলে সশস্ত্র তৎপরতায় জড়িত হয়েছে। পাকিস্তানে এরা যে হামলায় জড়িত হয়েছে তাতে ভারত-আমেরিকার সমর্থনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে উইঘুর কি ভিকটিম না আইএসের সহযোগী সন্ত্রাসীÑ এ প্রশ্ন এখন বাইডেনের সামনে ঝুলছে।

আমরা ইমরান খানের চীন সফরে ফিরে আসি। ইমরানের এবারের সফরের মুখ্য দিক অলিম্পিক নয়। তিনি এবার চীনা সরকারি অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে নয়, বরং এবার বিপুল চীনা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) মানে ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে ফিরবেন। সে কারণে পাকিস্তানের মিডিয়াগুলোতে একটাই নিউজ, ‘চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক এতে আরেক উচ্চতায় যাচ্ছে। এফডিআইকে আকর্ষণীয় সুবিধা হিসেবে দেখা হয় এ জন্য যে, অবকাঠামো নির্মাণে কোনো দেশের সরকার বিদেশী ঋণ নেয়। কিন্তু এই এফডিআই বিনিয়োগ নেয়া ঋণ হলেও সরকার তা নেয় না। ফলে ঋণের বোঝা বাড়ায় না তো বটেই, উল্টো ঋণের বোঝা কমাতে বা পরিশোধে ওই বৈদেশিক মুদ্রা সেখানে সাহায্য করে। কারণ ওই বিনিয়োগ বিদেশী মুদ্রায়।

ক’দিন আগেই খুব কড়া শর্ত চাপিয়ে আইএমএফ পাকিস্তানে লোন ছাড় করতে রাজি হয়েছে। তাই অনুমান করা হচ্ছে চীন সেই ঋণ পরিশোধে পাকিস্তানকে এফডিআই জোগাড় করে দিয়ে সাহায্য করতে যাচ্ছে। সার কথায় পাকিস্তান তা হলে ইমরানের এ সফরের মাধ্যমে আরো গভীর সম্পর্কে চীনের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে।
অতএব সে জন্যই কি নেড পাইস ওই প্রেস ব্রিফিং থেকে নতুন সম্পর্ক সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে?
কেন আমেরিকার পাকিস্তানকে খুবই দরকার
গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ রয়টার্সের এক নিউজ বলছে, আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিøঙ্কেন তাদের সংসদের শুনানিতে কেন আমেরিকার পাকিস্তানকে জরুরি দরকার তা ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তিনি পরিষ্কার করে রাখেন যে, পাকিস্তানের বহুবিধ স্বার্থ আছে যেগুলোর অনেকই আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থের সাথে মেলে। যেমন আমেরিকা চাইবে অন্তত তালেবানদের গাইড করা এবং তালেবানের প্রতিদ্ব›দ্বী যেসব আরো রেডিক্যাল ইসলামী সশস্ত্র গ্রæপ আছে তাদের নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিতে পাকিস্তান তাদের সহায়তা করুক। এ কারণে পাকিস্তান আমেরিকার কাছে প্রয়োজনীয় এবং তাই পার্টনার হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *