জাতীয় পার্টিতে ভাঙনের আশঙ্কা

সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। গত দুই মেয়াদে বিরোধীদলীয় আসনে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দলটি। এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থায়ও সমালোচনা ও নাটকীয়তার শেষ ছিল না জাতীয় পার্টিতে। তার মৃত্যুর পরও সেই নাটকীয়তা, আলোচনা-সমালোচনা চলমান। সর্বশেষ গতকাল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ আগামী ২৬ নভেম্বর জাতীয় পার্টির দশম জাতীয় কাউন্সিলের ডাক দিয়েছেন। এ উপলক্ষে নিজেকে আহ্বায়ক ঘোষণা করেছেন তিনি।

৯ম কাউন্সিলের মাধ্যমে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হয়েছেন জি এম কাদের। বর্তমানে তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতাও। তিন বছরমেয়াদি কমিটির সময় শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরে। কিন্তু তার আগেই জাতীয় পার্টির দশম জাতীয় কাউন্সিলের ডাক দিয়েছেন পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। আগামী ২৬ নভেম্বর রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এই কাউন্সিল করার ঘোষণা দিলেন। এ উপলক্ষে নিজেকে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের কমিটি ঘোষণা করেছেন। যেখানে ছয়জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্যসচিব করা হয়েছে তার রাজনৈতিক সচিব জাতীয় পার্টির সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মসীহকে। যুগ্ম আহ্বায়করা হলেন- সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, আবু হোসেন বাবলা এমপি, মুজিবুল হক চুন্নু এমপি ও সালমা ইসলাম এমপি। এই আহ্বায়ক কমিটির কোনো স্তরেই নেই দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রওশন এরশাদ কাউন্সিল আহ্বান ও আহ্বায়ক হতে পারেন বলে দাবি করেছেন তার সমর্থকরা। তবে জি এম কাদেরের সমর্থকরা বলছেন, কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত বর্তমান কমিটির মেয়াদ অতিবাহিত হয়নি এখনো। এই অবস্থায় রওশন এরশাদের আহ্বায়ক কমিটি বৈধ নয়।

জি এম কাদেরপন্থী একাধিক নেতা বলেন, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের একটি কার্যকর নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে কথা বলছেন। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি সরকারের কঠোর সমালোচনা করছেন। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন জোটের বিপরীতে বিরোধী দলগুলোর একটি জোট গঠন ও বিএনপির সাথে জোট করার আলোচনাও চলছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ। এমন এক মুহূর্তে দলের কাউন্সিল আহ্বান করলেন রওশন এরশাদ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জাতীয় পার্টিতে শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ পদেও পরির্বতন হতে যাচ্ছে। চিফ হুইপ পদে রয়েছেন রংপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান রাঙা। তাকে সরিয়ে নতুন কাউকে এই পদে আসীন করা হচ্ছে বলে রওশন এরশাদ ঘনিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, রাঙা জি এম কাদেরের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। আর নানা কারণে সরকারও এই পরিবহন ব্যবসায়ীকে পছন্দ করছেন না। গুঞ্জন রয়েছে, এরই মধ্যে চিফ হুইপ পদে মনোনয়ন দিয়ে স্পিকার বরাবর ডিও লেটারও দিয়েছেন রওশন এরশাদ। রাঙার জায়গায় ফেনী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য লে. জে. (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কিংবা কাজী ফিরোজ রশীদ হতে পারেন পরবর্তী চিফ হুইপ।

২০০৯ সাল থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। গত দুই মেয়াদে (২০১৪ সাল থেকে) জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় আসনে রয়েছে জাতীয় পার্টি। চলতি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই তিনি মারা যান। চরম অসুস্থ থাকা অবস্থায় মৃত্যুর প্রায় দেড় মাস আগে (৫ মে) তার ছোট ভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে (জি এম কাদের) জাতীয় পার্টির উত্তরসূরী ঘোষণা করে যান। কয়েক মাস ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকার পর একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর দলের ৯ম কাউন্সিলে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জি এম কাদের।

মহাসচিব হন মসিউর রহমান রাঙা। এই কাউন্সিলে জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হন এরশাদ পত্নী রওশন এরশাদ। এরশাদের মৃত্যুর পর দেবর-ভাবীর (জি এম কাদের-রওশন) মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। পার্টি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতার পদ রওশন এরশাদকে ছেড়ে জাপার চেয়ারম্যান পদ নিশ্চিত করেন জি এম কাদের। এরপরও মাঝখানে নানা ইস্যুতে কাদের ও রওশন গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তবে উভয় কূল রক্ষা করে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হন কাদের। মাঝখানে দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ২৭ জুন দেশে ফিরেন রওশন। ওঠেন গুলশানের একটি ফাইভ স্টার হোটেলে। সেখান থেকেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। যোগ দেন বাজেট অধিবেশনে। ৫ জুলাই ফের তিনি থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য যান। ঢাকায় থাকা অবস্থায় হোটেলে জাতীয় পার্টির ব্যানারে একটি সভা আহ্বান করেছিলেন। যেখানে পদবঞ্চিত ছাড়া শীর্ষ নেতাদের কাউকেই পাননি তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ের প্যাডে রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ্ স্বাক্ষরিত গতকালের এক পৃষ্ঠার একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয় গণমাধ্যমে। যেখানে তারিখ উল্লেখ আছে ৩১ আগস্ট। তবে এর সাথে জাতীয় পার্টির প্যাডে রওশন এরশাদের বক্তব্য সংবলিত আরো তিন পাতা যুক্ত করা হয়। এতে ২৩ আগস্ট ২০২২ উল্লেখ রয়েছে। যেখানে রওশন এরশাদ স্বাক্ষর করেছেন।

রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির দশম কাউন্সিল আহ্বান এবং আহ্বায়ক কমিটি গঠন প্রসঙ্গে বিস্তারিত যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় পার্টির গঠনতান্ত্রিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য, নিয়মাবলি এবং পার্টির মূল আদর্শ সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। বর্তমানে পার্টি গঠনতান্ত্রিক গৃহীত আদর্শ, নিয়ম ও নীতিমালা থেকে সরে গিয়ে ভ্রান্তপথে অগ্রসর হচ্ছে।’

এ বিষয়ে গোলাম মসীহ নয়া দিগন্তকে বলেন, ম্যাডাম (রওশন এরশাদ) এখন অনেকটাই সুস্থ। সেপ্টেম্বর মাসের যেকোনো দিন তিনি দেশে ফিরবেন আশা করছি। সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ পরিবর্তনের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই বলে দাবি করেন।

তবে, রাতে এ বিষয়ে জি এম কাদেরের প্রেসসচিব-২ দেলোয়ার জালালি স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম রওশন এরশাদ এমপি যে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছেন, তা সম্পূর্ণ অবৈধ, অনৈতিক ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কমিটি গঠন ও কাউন্সিল ঘোষণার কোনো এখতিয়ার নেই প্রধান পৃষ্ঠপোষকের। কাউন্সিলে গঠিত একটি বৈধ কমিটি ভেঙে দেয়ার কোনো ক্ষমতা জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ছাড়া আর কারো নেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শুধু জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান আহ্বায়ক কমিটি গঠন এবং জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করতে পারেন।নয়া দিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *