ডেঙ্গু আতঙ্কে নগরবাসী

দেশে প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার কম হলেও প্রতিদিন প্রায় তিন শ’ মানুষ আক্রান্ত হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আশানুরূপ পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। তবে আজ রোববার থেকে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। অবশ্য তাদের অভিযানে মশা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে জরিমানার দিকে বেশি নজর দিতে দেখা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে গতকাল জানানো হয়, দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরো ২৯৪ জন। এদের মধ্যে ২৪৪ জন ঢাকার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং বাকি ৫০ জন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত এক হাজার ২৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে ৮৪৯ জন ঢাকার মধ্যে এবং ১৭৪ জন রোগী ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট আট হাজার ৩৯০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় ছয় হাজার ৮৩২ জন এবং ঢাকার বাইরে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৫৫৮ জন ডেঙ্গু রোগী। অন্য দিকে চিকিৎসা শেষে সাত হাজার ৩৩৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। এদের মধ্যে পাঁচ হাজার ৯৭০ জন ঢাকার এবং বাকি এক হাজার ৩৬৫ জন ঢাকার বাইরের বাসিন্দা। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৩২ জন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিলে রোগী ছিল ২৩ জন, মে-তে ১৬৩ জন, জুনে ৭৩৭ জন এবং জুলাইতে রোগী ভর্তি হয় ১৫৭১ জন। অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে।

স্ত্রী ও শিশু সন্তান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাদেরকে ভর্তি করেছেন সেকেন্দার আলী। তিনি বলেন, স্ত্রী গর্ভবতী। আর কয়েকদিন পরই ডেলিভারির তারিখ। অথচ এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। চিকিৎসক বলেছেন তাকে রক্ত দিতে হবে। এখন আমরা খুবই আতঙ্কে আছি। জানি না আল্লাহ কপালে কী লিখে রেখেছেন।

সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, গত বছর পুরো পরিবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলাম। সাত দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। ডেঙ্গু হলে কত কষ্ট হয় তা আমরা জানি। এবারো ডেঙ্গু বেড়েছে। গত কয়েকদিনের বৃষ্টির পর মশার অত্যাচারও বেড়েছে। এখন মশারি ছাড়া ঘুমাই না। তারপরও সবসময় আতঙ্ক কাজ করে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার নয়া দিগন্তকে বলেন, আগামী কয়েকদিন ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী মাসেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বাড়তে পারে। তিনি বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। এ বছর বর্ষার শুরু থেকে বেশি বৃষ্টিপাত হয়নি। থেমে থেমেই হয়েছে, যা বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূলে ছিল। আর তাতেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। ডেঙ্গু রোধে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা কেমন- এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের কার্যক্রম নিয়ে এখন আর কথা বলতে ইচ্ছা করে না। মশা কেন বাড়ছে তা তারাই ভালো বলতে পারবে। তাদেরকে আশঙ্কার কথা বারবার বলার পরও তারা সাবধান হয় না। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয় না।

এ ছাড়া জনগণের অসচেতনতাও ডেঙ্গু বৃদ্ধিতে সহায়ক বলে জানান এ কীটতত্ত্ববিদ।
ডিএনসিসির অভিযান : ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আজ থেকে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। দশটি অঞ্চলে দশটি টিম এ অভিযান পরিচালনা করবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে। এ সময় এডিসের লার্ভা পেলেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র মো: আতিকুল ইসলাম। গতকাল দক্ষিণখানের মধ্য আজমপুর এলাকায় এডিস মশার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানে গিয়ে মেয়র বলেন, বাসাবাড়ি-অফিসে জমে থাকা পানিতে এডিসের লার্ভা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা হবে। কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ দিকে রাজধানীতে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু রোগী বাড়লেও মেয়র বলছেন ভিন্ন কথা। ওই অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি মেয়র বলেন, ধারণা করা হয়েছিল অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই আমরা বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জনগণকে সচেতন করাসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে আসছি। তবে অতীতের সাথে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেকটা কম। আমাদের কার্যকর পদক্ষেপের কারণে এখন পর্যন্ত ডিএনসিসি এলাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি। পাশের অনেক দেশের তুলনায়ও আমাদের দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক কম। ডেঙ্গু পুরোপুরিভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই আমাদের লক্ষ্য। এ সময় নগরবাসীর উদ্দেশে মেয়র বলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে পুরোপুরিভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে জনগণের সহযোগিতা অতি গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সহযোগিতা পেলে আমরা ডেঙ্গু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।

নিজেদের বাসাবাড়িতে ফুলের টব, অব্যবহৃত টায়ার, ডাবের খোসা, চিপসের খোলা প্যাকেট, বিভিন্ন ধরনের খোলা পাত্র, ছাদ কিংবা অন্য কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *