ঢাবি সমাবর্তনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যা বলেছিলেন

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন পাকিস্তানের তখনকার গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে ভাষণ দেন তিনি।

উভয় ভাষণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সব আঞ্চলিকতা, প্রাদেশিকতা, শিয়া-সুন্নি, সিন্ধু, পাঞ্জাবি, বাঙালি ভেদাভেদ ভুলে মুসলমান এবং এক পাকিস্তানি চেতনাকে ধারণ করে সবাইকে জাতি গঠনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে যদি প্রাদেশিকতার বিষ ঢুকে যায় তাহলে আমরা কখনোই শক্তিশালী হতে পারব না। এরপর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, পূর্ববাংলাকে ভারতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চক্রান্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।

রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, পূর্ব বাংলার অফিসিয়াল ভাষা বাংলা হবে কি না তা এখানকার নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ঠিক করবেন। এটি সম্পূর্ণরূপে এ অঞ্চলের জনগণের বিষয়। তারাই এটি নির্ধারণ করবেন। আমি আশা করি, এ অঞ্চলের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী এ সমস্যার সমাধান হবে।

তিনি আরো বলেন, আমি পরিষ্কার ভাষায় এ কথা আপনাদের জানিয়ে দিতে চাই, বাংলা ভাষার প্রশ্নে এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাপনে, চাকরি-বাকরিতে কোনোরূপ ক্ষতি, হতাশা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ ঘটবে না। এ প্রদেশের অধিবাসী হিসেবে আপনারাই, আপনাদের প্রাদেশিক ভাষা যথাসময়ে নির্ধারণ করে নেবেন। তবে আমি আপনাদের পরিষ্কার বলে দিতে চাই, নিখিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে যাচ্ছে উর্দু। অন্য কোনো ভাষা নয়। একটি রাষ্ট্রভাষা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রকে কার্যকর এবং শক্তিশালী ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখা যায় না। ইতিহাস তাই বলে। তাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এ বিষয়ে সুরাহা যথাসময়ে হবে।

২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে প্রদত্ত ভাষণেও রাষ্ট্রভাষার বিষয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঠিক একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। এরপর তিনি বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে আন্তঃবিনিময়ের জন্য একটি লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা নির্ধারণ করা যেতে পারে। এটি হতে হবে উর্দু। অন্য কোনো ভাষা নয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে অবশ্যই উর্দু।

ইতিহাসবিদদের মতে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ভুল বোঝানো হয়েছিল এবং এর পেছনে পূর্ব বাংলারও কেউ কেউ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বাংলার মুসলমানরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা চায় এ ধারণা এ অঞ্চল থেকেও তখন কেউ কেউ তাকে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ভুল বুঝতে পেরে এরপর আর কখনো এ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।

১৯৪৮ সালে মৃত্যুর আগে বেলুচিস্তানে স্বাস্থ্য নিরসন জিয়ারতে অবস্থানকালে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক কর্নেল ডা: এলাহী বক্সের কাছে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে তার অবস্থান যে ভুল ছিল তা তিনি স্বীকার করেন। (সূত্র : বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস’ ভলিউম-১, মোহাম্মদ মোদাব্বের রচিত ইতিহাস কথা কয় এবং সাংবাদিকের রোজনামচা)।নয়া দিগন্ত অনলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *