বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের দায় প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা

অনলাইন ডেস্ক: দেড় হাজার মিটার বা তার চেয়ে বেশি দৈর্ঘ্যের সেতু, টোল সড়ক, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল, রিং রোডের মতো অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। বঙ্গবন্ধু সেতু ও মুক্তারপুর সেতু বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি। বাস্তবায়ন করছে পদ্মা বহুমুখী সেতু, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ একাধিক প্রকল্প। নিজস্ব তহবিল, বাংলাদেশ সরকার ও বিদেশী উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাস্তবায়ন করা ও বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর বিপরীতে বর্তমানে সংস্থাটির দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকায়।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ১১১তম বোর্ড সভার কার্যপত্রে বলা হয়, এখন পর্যন্ত সেতু কর্তৃপক্ষের আনুমানিক দায় ৫৬ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ২০৫৬ সাল পর্যন্ত সুদসহ কমপক্ষে ৬৭ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। সরকারি তহবিল থেকে নেয়া ঋণের সুদহার ১ শতাংশ। আর বৈদেশিক ঋণের সুদহার ২ শতাংশ। সব মিলিয়ে সুদের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।

সেতু কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে বলে প্রত্যাশা করছেন নীতিনির্ধারকরা। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এগুলোকে দেখছেন ‘জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প’ হিসেবে। সম্প্রতি সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভা-পরবর্তী সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, সেতু কর্তৃপক্ষের আওতায় বেশকিছু জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সেগুলো দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।

প্রকল্পগুলো থেকে নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশামাফিক ফলাফল পেতে হলে এগুলো বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ভাষ্যমতে, দেশী বা বিদেশী যে উৎস থেকেই ঋণ নিয়ে অবকাঠামোগুলো তৈরি হোক না কেন, সেগুলো সঠিকভাবে এবং সময়মতো বাস্তবায়ন জরুরি। তা না হলে বিপুল পরিমাণ ঋণ একসময় বোঝায় পরিণত হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ের মতো অবকাঠামো দরকার। এগুলো আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদানই রাখবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অবকাঠামোগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। গুড গভর্ন্যান্সের সঙ্গে অবকাঠামোগুলো তৈরি হচ্ছে কিনা, সাশ্রয়ীভাবে হচ্ছে কিনা, সময়মতো শেষ হচ্ছে কিনা, গুড ভ্যালু ফর মানি কিনা, প্রকল্প যাচাই-বাছাই ও ফিজিবিলিটি ঠিকমতো হচ্ছে কিনা—এগুলো কিন্তু গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। যেসব কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো বাস্তবায়ন করছে, তাদের ওপরই দায়িত্বটা বর্তায়।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান আরো বলেন, যদি প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যায়, সময়মতো শেষ না হয়, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা না থাকে তাহলে কিন্তু ইকোনমিক রেট অব রিটার্ন, ফাইন্যান্সিয়াল রেট অব রিটার্ন সঠিকভাবে পাওয়া যাবে না। তখন এসব অবকাঠামো অর্থনীতিকে গতিশীল করার বদলে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় দায় পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অর্থ বিভাগের কাছ থেকে ২৯ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সংস্থাটি। ঋণের সুদহার ১ শতাংশ। সুদসহ পদ্মা সেতুর ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৪০৩ কোটি টাকায়। চুক্তি অনুযায়ী এ ঋণ পরিশোধের জন্য ২০৫৫-৫৬ অর্থবছর পর্যন্ত সময় পাবে সেতু কর্তৃপক্ষ। ঋণ শোধ করা হবে পদ্মা সেতু থেকে আদায় হওয়া টোলের অর্থ থেকে।

২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট পদ্মা সেতুর ঋণ নিয়ে সরকারের অর্থ বিভাগের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে সেতু কর্তৃপক্ষ। চুক্তি অনুযায়ী, ৩৫ বছরে ১৪০টি ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। কোনো অর্থবছর কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে পরবর্তী সময়ে সুদসহ বকেয়া অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

সেতু কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। সাভারের ইপিজেড থেকে আশুলিয়া-বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে এ উড়ালসড়ক। জি টু জি পদ্ধতিতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে অর্থায়ন করছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। গত বছরের ২৬ অক্টোবর করা ঋণ চুক্তি অনুযায়ী, ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য চীন সরকার বাংলাদেশকে ১১২ কোটি ৬৯ লাখ ডলার বা প্রায় ৯ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। প্রিফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিটের (পিবিসি) আওতায় দেয়া এ ঋণ পাঁচ বছরের রেয়াতকালসহ ২ শতাংশ সুদে ২০ বছরের মধ্যে শোধ করতে হবে।

চট্টগ্রাম শহরে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী এবং বিদ্যমান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীতে নির্মাণ করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু টানেল। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন পথ তৈরি, চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দরসহ আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। টানেলটি তৈরিতে খরচ হচ্ছে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীনের এক্সিম ব্যাংক ২০ বছর মেয়াদি এ ঋণ দিচ্ছে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়ন করা সবচেয়ে বড় প্রকল্প বঙ্গবন্ধু সেতু। সংস্থাটির সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। এতে  বৈদেশিক ঋণ রয়েছে ২ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) ঋণ ৮৫৪ কোটি টাকা। এ ঋণের সুদহার দশমিক ৭৫ শতাংশ। পরিশোধের সময় ৩০ বছর। একইভাবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের ওভারসিজ ইকোনমিক কোঅপারেশনের (ওইসিএফ) ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৮২৯ ও ৮২৫ কোটি টাকা। দুটি সংস্থাই ঋণ দিয়েছে ১ শতাংশ সুদে। এর মধ্যে এডিবির ঋণ ৩০ বছরে এবং ওইসিএফের ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২০ বছরে।

সেতু কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া বঙ্গবন্ধু সেতুর সমুদয় ঋণ পরিশোধ হবে ২০৩৩-৩৪ অর্থবছরে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সেতুটির ডিএসএল বাবদ ৩ হাজার ১১৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়ন করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ধলেশ্বরী নদীর মুক্তারপুর সেতু। এছাড়া সংস্থাটি আরো একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, যেগুলোতে প্রয়োজন হয়েছে দেশী-বিদেশী ঋণ। ঢাকা সাবওয়ে, ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, যমুনা টানেলসহ আরো একাধিক প্রকল্প রয়েছে পরিকল্পনাধীন পর্যায়ে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে আরো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশী ঋণ।

সেতু কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলো এখন পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে যাচ্ছে। কর্ণফুলী টানেলও দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এক্সপ্রেসওয়েগুলোও ঝুঁকিমুক্ত প্রকল্প। এ ধরনের অবকাঠামো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। কিন্তু ঢাকায় যে মেট্রোরেল করা হচ্ছে, এ প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে সেতু কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনাধীন সাবওয়ে প্রকল্প নিয়েও ঝুঁকির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ এ ধরনের প্রকল্পে বিনিয়োগ বেশি, অর্থনৈতিক রিটার্ন কম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *