বিরোধী জোটে এক দফার প্রস্তুতি

অনলাইন ডেস্ক:  রাজনৈতিক বিতর্কের মুখেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন। বিগত দুটি নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যে নীতি সরকার অনুসরণ করেছে, মূলত তা-ই এবার বিস্তৃত করে আইনি রূপ দেয়া হয়েছে। নতুন এই আইন পাসের আগেই সরকারি দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিসহ বিরোধী বহু দল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, ‘এই আইন অর্থহীন, আরেকটি পাতানো নির্বাচনের নীলনকশা।’ বিরোধী দলগুলো মনে করছে, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া দেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।

জানা গেছে, বিএনপি তাদের নেতৃত্বাধীন একাধিক জোট ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে এখন নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে ‘এক দফা’ আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে বৃহৎ একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠনের চেষ্টা চলছে। ইসি আইন পাসের একদিন পর গতকাল বিএনপি জরুরি ভিত্তিতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক করেছে। জানা গেছে, বৈঠকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেয়ার দলীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সাথে এই দাবি আদায়ে আন্দোলনের কলাকৌশল কী হবে তা নিয়ে শীর্ষ নেতারা মত দিয়েছেন।

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে বৃহৎ একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছে বিএনপি। গত কয়েক মাস ধরেই দলটি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সেই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। সমমনা দলগুলোর সাথেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জানা গেছে, এক দফা দাবির এই আন্দোলনে এবার বিএনপি ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক দলের ফিগারকে নেতা মেনে নয়, নিজেরাই সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নেতৃত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যু ছাড়া আগামীতে অন্য কোনো ইস্যুতে সরকারের ডাকে সংলাপে না বসারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা আলাপকালে বলেছেন, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের এক দফা দাবিতেই এবার আন্দোলন হবে। একাধিক প্লাটফর্ম থেকেও আন্দোলনের সূচনা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিএনপির নেতৃত্বে একটি বৃহৎ প্লাটফর্ম, ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে ভিন্ন একটি প্লাটফর্ম এবং বাম দলগুলো নিয়ে আরেকটি প্লাটফর্ম গড়ে উঠতে পারে। কর্মসূচি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৃহৎত্তর প্লাটফর্মের নেয়া সিদ্ধান্তই অন্য দলগুলো সমর্থন করবে অথবা তারাও স্বাধীনভাবে দলীয় কর্মসূচি নির্ধারণ করে মাঠে থাকবে।

বিএনপির সিনিয়র এক নেতা জানান, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সরকারবিরোধী সব পক্ষকে এক টেবিলে বসানোর যে ভাবনা নিয়ে তারা এগোচ্ছেন, তা বিদ্যমান জোটকাঠামোতে সম্ভব না-ও হতে পারে। সরকারবিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতার মনোভাব থাকায় আন্দোলনের ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্ম হতে পারে। এ লক্ষ্যে বিএনপি কয়েক মাস আগে একটি রূপরেখাও তৈরি করেছে, যা জাতির সামনে তুলে ধরে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়া হবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগের অবৈধ সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ। এর কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি ও জনগণের ঐক্য গড়ে তুলে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে হবে।

বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করছেন, এবারের আন্দোলন সফল হবে। তাদের ভাবনা, সরকারের উপর নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেশী-বিদেশী কঠিন চাপ রয়েছে। এই চাপ আগামী দিনে আরো বাড়বে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশে গণতন্ত্রহীনতা, গুম খুনের কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বে মানবাধিকারকর্মীরা একটি কঠিন অবস্থানে গেছে। জাতিসঙ্ঘও তাদের সঙ্গে একমত হচ্ছে। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশ যারা মানবাধিকারে বিশ্বাস করে, তারাও তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে মত প্রকাশ করছে। সুতরাং তারাও পুরো বাংলাদেশের ভেতরের মানুষ যেমন করে পর্যবেক্ষণ করছে সেভাবে অবস্থান নিচ্ছে। মানুষ অবস্থান নিচ্ছে বলে হাজার হাজার মানুষ এখন রাস্তায় বেরিয়ে আসছে। একইভাবে বিশ্বে আন্তর্জাতিকভাবে যারা আছে তারাও কিন্তু অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। তারা পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশের কাছে তাদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে। এরকম একটি অগ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নিয়ে সরকার সামনে এগিয়ে যেতে পারবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের দাবি বিএনপির পুরনো রাজনৈতিক দাবি। এই দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপি দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়ায় ওই নির্বাচন বর্জন করে দলটি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনেও বিএনপির দাবি ছিল এটি। দাবি পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও দলীয় সরকারের অধীনে তারা নির্বাচনে অংশ নেয়। আর মাত্র ৭টি আসন পায় তারা। আগামী বছর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের বছর। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার না হলে, আগামী নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা ইতোমধ্যে দিয়েছে বিএনপি। আন্দোলনেই সমাধান দেখছে তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *