রূপপুরের সঞ্চালন লাইনের বড় চ্যালেঞ্জ নদী পারাপার

অনলাইন ডেস্ক: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন। সাত প্যাকেজের মাধ্যমে এ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। প্রকল্পের বেশির ভাগ অর্থায়ন হচ্ছে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায়। এলওসির আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এ-সংক্রান্ত অনেক শর্তও পরিপালন করতে হচ্ছে পিজিসিবিকে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাও বেড়েছে। কয়েকটি প্যাকেজের কাজ এগিয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। বিশেষ করে নদীর ওপর দিয়ে সঞ্চালন লাইন পার করতে গৃহীত প্যাকেজটি বাস্তবায়ন করাই এখন পিজিসিবির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে প্যাকেজটি বাস্তবায়নে ভারতীয় এলওসির আওতায় অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পিজিসিবি।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদনক্ষম হয়ে উঠবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট। এটি উৎপাদন সক্ষম হলেও সময়মতো সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে বসিয়েই রাখতে হবে। যদিও এর ক্যাপাসিটি চার্জ, ঋণের অর্থ, সুদ পরিশোধসহ অন্যান্য ব্যয় ঠিকই বহন করতে হবে সরকারকে। কিন্তু প্রকল্পের প্যাকেজ-৬-এর আওতায় সঞ্চালন লাইনের ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী পারাপারের কাজটি বাস্তবায়নের গতি বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অর্থনৈতিক মুনাফাযোগ্যতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। পিজিসিবির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্যাকেজটির অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ।

বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের এপ্রিলে। যদিও এর কাজ শুরু হয় তিন বছর পর। ১০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকার এ প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থায়ন হওয়ার কথা ভারতীয় এলওসির আওতায়। সে অনুযায়ী প্রকল্পে ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন হওয়ার কথা ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। ১ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। বাকি ১ হাজার ২৩৫ কোটি টাকার জোগান দেয়ার কথা পিজিসিবির নিজেরই। এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের বেশির ভাগই প্রকল্পের প্যাকেজ-৬ তথা নদী পারাপারের সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, যার পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা। প্রকল্পের সাতটি প্যাকেজের সবক’টিতেই কাজ করছে ভারতীয় চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ছয়টির কাজ শুরু হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত নদী পারাপারের কাজটি শুরুই করা যায়নি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো এলওসির আওতায় গৃহীত প্রকল্প ঋণগুলোয় নানা ধরনের শর্ত থাকে। মূলত এসব শর্ত পালন করতে গিয়েই প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, পরামর্শক ও কর্মী নিয়োগ এবং প্রকল্পের মালপত্র ক্রয়সহ বড় একটি অংশের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। বিশেষ করে এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার কাছ থেকে শর্ত চূড়ান্ত করে প্রকল্পের আগ্রহপত্র আহ্বান, ঠিকাদারের শর্টলিস্ট তৈরি ও নথিপত্র চূড়ান্ত করতেই ২৪০ দিন পার হয়েছে। ধীরগতির কারণে এরই মধ্যে এক দফা প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে বর্ধিত মেয়াদেও প্রকল্পটি শেষ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ভারতীয় এলওসির আওতায় নদী পারাপার প্যাকেজের অর্থায়নের সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে পিজিসিবি। এজন্য আলাদাভাবে নতুন দরপত্র আহ্বান করেছে পিজিসিবি। এরই মধ্যে প্যাকেজের অর্থায়নও জোগাড় হয়েছে। এ বিষয়ে পিজিসিবি জানিয়েছে, প্রকল্পের প্যাকেজ-৬-এর আওতায় তিনটি রিভারক্রসিং সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প (বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণে গৃহীত প্রকল্প) থেকে অবমুক্ত করে সরকারের অর্থায়ন স্কিমভুক্ত করা হয়। এ স্কিমের আওতায় ‘যমুনা ও পদ্মা নদীতে ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি রিভারক্রসিং সঞ্চালন লাইন নির্মাণ’কাজের ঠিকাদারের সঙ্গে সম্প্রতি চুক্তিও হয়েছে।

প্যাকেজের আওতায় নদী পারাপারে মোট ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে যমুনা নদীতে সাত কিলোমিটারের একটি ৪০০ কেভি লাইন, সমদৈর্ঘ্যের আরেকটি ২৩০ কেভি লাইন ও পদ্মা নদীতে দুই কিলোমিটারের একটি ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হওয়ার কথা। নদী পারাপারের এ প্যাকেজে কাজ করছে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড। এ কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে গত ১৭ আগস্ট চুক্তি স্বাক্ষর করে পিজিসিবি। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্টের মধ্যে এ প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। যদিও গত মাস পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ।

শুধু নদী পারাপারের প্যাকেজ নয়, সার্বিকভাবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রকল্পটিরই বাস্তবায়নের গতি সন্তোষজনক নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, তার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের গোটা সঞ্চালন লাইন নিয়েই আশঙ্কা বাড়ছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এ লাইন নির্মাণে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশ।

প্রকল্পটিতে ধীরগতির বিষয়ে পিজিসিবির ঊর্ধ্বতনদের বক্তব্য হলো প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন বিলম্বিত, জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়ার কারণে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কভিড মহামারীর কারণে প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল প্রায় দেড় বছর।

রূপপুর সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত পিজিসিবির দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, সঞ্চালন লাইন প্রকল্পে মোট সাত ধাপে কাজ হচ্ছে। ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত এ লাইনের ঋণ নিয়ে বেশ জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে নানাবিধ শর্তপূরণের দিক থেকে প্রকল্পটি অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় ভিন্ন ধরনের। এ কারণে প্রকল্পের শুরু থেকেই বিলম্ব হয়ে গিয়েছে। তবে কভিড-পরবর্তী সময়ে এ প্রকল্পে আর কোনো ঢিলেমি নেই। এখন পুরোদমে কাজ চলছে।

পিজিসিবি সূত্রে জানা গিয়েছে, রূপপুরের জন্য নির্মীয়মান সঞ্চালন লাইনের দৈর্ঘ্য ৪৬৪ কিলোমিটার। এ দীর্ঘ লাইন নির্মাণে রিভারক্রসিং রয়েছে ১৬ কিলোমিটার। সঞ্চালন লাইন নির্মাণে রিভারক্রসিংয়ের কাজটি তুলনামূলক জটিল। এটির জন্য গত মাসেই ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে পিজিসিবি।

পিজিসিবির ওয়েবসাইটে দেয়া প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর প্রকল্পটির সময়সীমা ধরা হয়েছে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের প্রায় সাড়ে চার বছর অতিবাহিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পিজিসিবির হাতে সময় রয়েছে আর মাত্র ১ বছর ৩ মাস। সংস্থাটির চলতি বছরের হালনাগাদ তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। প্রকল্পে ৪৬৪ কিলোমিটার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, ২০৫ কিলোমিটার ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ, ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি বে-এক্সটেনশন, এছাড়া ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবস্থাপনা, ফ্রিকোয়েন্সি ড্রপ, ইমার্জেন্সি কন্ট্রোল সিস্টেমসহ কয়েক ধরনের কাজ হবে।

পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গোলাম কিবরিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, কভিড মহামারীর কারণে সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ধীরগতি নামে। বিশেষ করে সঞ্চালন লাইন নির্মাণে বিদেশী শ্রমিকরা কাজ করবেন। সে কারণে এসব কাজে সংশ্লিষ্ট সময়ে লোকবল নিয়োগ দেয়া যায়নি। একই সঙ্গে অর্থায়ন-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে শুরুতেই বিলম্বিত হয়েছে। তবে এসব কাজে গতি ফিরেছে। আমরা চেষ্টা করছি রূপপুর চালুর আগেই কাজ শেষ করার।

রূপপুর সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক কিউএম শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, সব সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। সার্বিক অগ্রগতি ৪০-৪৫ শতাংশের মতো। এ প্রকল্পের মালপত্র ৭০ শতাংশ দেশে এসে গিয়েছে। আগামী বছরের অক্টোবর নাগাদ এ কাজ শেষ করতে পারব বলে আশা করছি। শুধু রিভারক্রসিংয়ের কাজ বাকি থাকবে। কাজটি আমরা এলওসির ঋণ থেকে বেরিয়ে এসে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ফলে আশা করছি সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ যথাসময়ে শেষ হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *