চট্টগ্রামের মিরসরাই উপকূলের সন্দ্বীপ চ্যানেলে বালু তোলার ড্রেজার ডুবে নিখোঁজ আট শ্রমিকের মধ্যে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন আরো চার শ্রমিক। মঙ্গলবার রাত ৯টায় একজন ও বুধবার সকাল ১০টায় আরো তিন শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করে কোষ্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। এরপর থেকে একইদিন বিকলে ৪টা পর্যন্ত ভলগাট দিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেও আর কোন লাশ উদ্ধার করা যায়নি। নিখোঁজ চার শ্রমিককে উদ্ধারের জন্য চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন থেকে এক্সপার্ট টিম নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মিনহাজুর রহমান।

জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে গত সোমবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের বসুন্ধরার ৩ নম্বর জেটি এলাকার পশ্চিমে এ ড্রেজারডুবির ঘটনা ঘটে। নিখোঁজ হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে মঙ্গলবার রাত ৯টায় আল আমিন নামে এক শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর তার লাশের ময়নাদন্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের আপত্তি না থাকায় এবং শরীরে পছন ধরে যাওয়ায় অন্য তিন শ্রমিকের লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান মিরসরাই থানার অফিসার ইনচার্জ মো. কবির হোসেন। নিখোঁজ শ্রমিকদের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে আনিচ মোল্লার এক ছেলে, ইমাম মোল্লা, আব্দুল হক মোল্লার ছেলে মাহমুদ মোল্লা, সেকান্দার বারির ছেলে মো. জাহিদ বারি ও রহমান ফকিরের ছেলে মো. আল-আমিন ফকির। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন আনিচ মোল্লার বড় ছেলে শাহিন মোল্লা, নুরু সরদারের ছেলে আলম সরদার ও রহমান খানের ছেলে তারেক মোল্লা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বসুন্ধরা ৩নং এলাকায় বেড়িবাঁধ থেকে ৫০০ ফুট দূরত্বে সাগরের মাঝে সৈকত এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বালু উত্তোলনের ড্রেজার মেশিন সৈকত-২ ছিল। এ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি মিরসরাইয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বালু সরবরাহের কাছ করছিল। তারা উপ-ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান খোকন কনষ্ট্রাকশনের জন্য বালু উত্তোলন করেছিলেন মো. গাফফারের মালিকানাধীন সৈকত এন্টারপ্রাইজের ড্রেজার।

ড্রেজার মেশিন সৈকত-২-এর ব্যবস্থাপক মো.রেজাউল করিম জানান, ঘটনাস্থলে আরো ৬টি ড্রেজার রাখা ছিল। সতর্কতা সংকেত পেয়ে অপরাপর সকল শ্রমিক নিরাপদ স্থানে চলে গেলেও সমুদ্রে ঢেউ বেশি থাকায় আমাদের শ্রমিকদের আনার জন্য নৌকা ড্রেজারের কাছে যেতে পারেনি। শ্রমিকদের উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদল অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

অভিযোগ রয়েছে, দুর্ঘটনার ৪৮ ঘন্টা পরও দুর্ঘটনাস্থলে দেখা মেলেনি ড্রেজার মালিক মো. গাফফারের। প্রশাসন ও ড্রেজার মালিকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়নি শ্রমিকদের পরিবারগুলোকে।

এদিকে বুধবারও আপনজনদের খোঁজে সাগর পাড়ে সারাদিন অপেক্ষা করেন স্বজনরা। তাদের একজন শহীদুল ইসলাম বলেন, তারেক মোল্লা নামে নিখোঁজ হওয়া শ্রমিক আমার ফুফাত ভাই। অন্য শ্রমিকরাও একই এলাকার। গতকাল রাতে তারা সাগরে নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে রাতে এখানে আসার জন্য বাস কাউন্টারে গেলেও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে রাতে রওনা দিতে পারিনি। ভোর রাতে রওনা দিয়ে দুপুরে এসে এখানে এসে পৌছায়। চারজনের লাশ উদ্ধার হলেও এখনো তারেক মোল্লাসহ আরো চারজন নিখোঁজ রয়েছে। তাদের লাশ আদৌ পাবো কি না বুঝতে পারছি না।

ড্রেজার থেকে বেঁচে ফেরা শ্রমিক মো. সালাম জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে তীব্র বাতাস ও ঢেউ ওঠায় সৈকত-২ নামে তাদের ড্রেজারটি মিরসরাই উপকূলের সন্দ্বীপ চ্যানেলে ডুবে যায়। ড্রেজারটির মালিক সৈকত এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে নিয়োগ দিয়েছে বেপজা। ড্রেজারটিতে থাকা ৯ শ্রমিকের মধ্যে তিনি কিনারে আসতে পারলেও বাকি ৮ শ্রমিক আটকা পড়েন। তিনি আরো বলেন, আমি আধা ঘন্টা আগে সেখান থেকে পাড়ে আমি। তারা কিছুক্ষণ পর আসবে বলে আর আসতে পারেনি। এভাবে সাথের ভাইগুলো চলে গেছে ভাবতেই খারাফ লাগে।

ড্রেজারটি উদ্ধার ও নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধানের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডের ডুবুরি দল, উপজেলা প্রশাসন, মিরসরাই থানা পুলিশ কাজ করছে।

ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স চট্টগ্রাম জোন-৩ আগ্রাবাদ এর উপ-সহকারি পরিচালক আবদুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, ড্রেজারটি উল্টে গিয়ে এক চতুর্থাংশ প্রায় ৫ ফুট মাটির ভেতরে ঢুকে গেছে। ফলে ড্রেজারের দুকম্পার্টমেন্টের ভেতরে বালু ঢুকে ভরাট হয়ে গেছে। এতে করে ওখানে ডুবুরিরদল ডুকতে পারছে না।

এরআগে বুধবার সকালে বাকি দু’টি কম্পার্টমেন্টের ভেতর থেকে বালি ও মাটি সরিয়ে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ বাকি চারজনের লাশ ভেতরে বালি চাপা অবস্থায় আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ড্রেজারটি উল্টানো গেলে বা সাগরের কিনারে আনা গেলে উদ্ধার কাজ আরো সহজ এবং দ্রুত হতো। সেজন্য উদ্ধারকারী বড় জাহাজ বা ক্রেন প্রয়োজন। উদ্ধারকারী জাহাজ বা ক্রেন আনার জন্য ইউএনওকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

কোস্টগার্ড মিরসরাই স্টেশনের সিপিটি অফিসার (সিপিও) জহিরুল ইসলাম বলেন, ড্রেজার থেকে লাশ বের করার জন্য বলগেট ও সী ট্রাক দিয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। সাগরের নিচের মাটি নরম হওয়াতে ড্রেজারটির একটি অংশ মাটিতে ডুকে গেছে। ফলে মাটি সরিয়ে ভেতরে ডুবুরি প্রবেশ করতে পারছেনা। উদ্ধারকারী বড় জাহাজ বা ক্রেন আনলে দ্রুত সময়ে ড্রেজার থেকে নিখোঁজ বাকি চারজনের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

মিরসরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কবির হোসেন বলেন, ড্রেজার ডুবে আট শ্রমিক নিখোঁজের মধ্যে আটজনের লাশ পাওয়া গেছে। উদ্ধারকৃত আল আমিনের লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। অন্যদের সুরতহাল করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত লাশের শরীরের অনেকাংশ গলে যাওয়াতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ও লাশের স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষাপটে বাকি লাশগুলো ময়নাতদন্ত ছাড়া পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ড্রেজার ডুবে শ্রমিক নিহতের বিষয়টি তদন্তনাধীন রয়েছে। সব লাশ উদ্ধার করা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ডুবে যাওয়া ড্রেজারটি থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ড্রেজারের কিছু অংশ মাটিতে ঢুকে যাওয়াতে ভেতরের কর্ম্পামেন্টে ডুবুরির দল প্রবেশ করতে পারছে না। ভেতরে বালি ও মাটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় এটি কিনারেও আনা যাচ্ছে না। উদ্ধারকারী জাহাজের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেছেন, মিরসরাই আসতে তিনটি লাগবে, এছাড়া নৌবাহিনী জাহাজ দিতে পারবে না বলেছে। বেসরকারি একটি কোম্পানির সাথে যোগাযোগ চলছে তাদের প্রতিনিধিদল দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে উদ্ধারকারী জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে জানাবে বলেছে। সাগরে পানির স্রোত বেশি থাকায় ড্রেজারটি কিনারে না আনা পর্যন্ত ভেতর থেকে বাকি লাশ বের করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। নয়াদিগন্ত ডেস্ক:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *